চুল কর্তন: শিক্ষক বুঝুক নিজের ভুল, শিক্ষার্থী ভুলুক মনের কষ্ট - শিক্ষাবিদের কলাম - দৈনিকশিক্ষা

চুল কর্তন: শিক্ষক বুঝুক নিজের ভুল, শিক্ষার্থী ভুলুক মনের কষ্ট

মো. রহমত উল্লাহ্ |

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়, 'গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার হলে ঢোকার সময় বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী প্রক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন দরজায় কাঁচি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শিক্ষার্থীরা হলে ঢোকার সময় যাদের মাথার চুল হাতের মুঠোর মধ্যে ধরা যায়, তাদের সামনের অংশের বেশ খানিকটা কেটে দেন তিনি। এভাবে ১৪ শিক্ষার্থীর চুল কাটা পড়ে। ওই ঘটনা মীমাংসা না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সোমবার দুপুরে পরীক্ষা বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে শিক্ষক ফারজানা শিক্ষার্থীদের গালিগালাজ করে পরীক্ষার হলে যেতে বাধ্য করেন। এর প্রতিবাদ করলে নাজমুল হাসান তুহিন নামে প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে গালিগালাজ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের হুমকি দেন। এই ঘটনার পর ‘অপমান সইতে না পেরে’ তুহিন রাতে দ্বারিয়াপুরের শাহমুখদুম ছাত্রাবাসের নিজ কক্ষে দরজা আটকে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। সহপাঠীরা বিষয়টি টের পেয়ে তাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।' এখান থেকে অনেক কিছুই শিখবার আছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের চুল কেটে দেওয়া শিক্ষকের কাজ নয়। বরং তিনি তার শিক্ষার্থীদের চুল পরিপাটি করে রাখার উপদেশ দিতে পারেন। শিক্ষকের কাজ শাস্তি দেওয়া নয়, শিক্ষা দেওয়া। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও ধর্মীয় বিধানে কাউকে কোন শিক্ষা দেওয়ার জন্য শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়নি। শিক্ষা হচ্ছে আচরণের স্থায়ী অনুকূল পরিবর্তন। জোর করে দু'একবার চুল কেটে দিয়ে কারো চুল চিরদিন ছোট রাখার বা পরিপাটি রাখার শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীর মনে স্থায়ী হবার সম্ভাবনা নেই এমন বল প্রয়োগের মাধ্যমে দেওয়া কোন শিক্ষা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তারুণ্যে ভরপুর শিক্ষার্থীদের ওপর বল প্রয়োগ হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া একজন শিক্ষকের অবশ্যই থাকতে হবে এমনটি বুঝবার মতো মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান। অবশ্যই থাকতে হবে শিক্ষা মনোবিজ্ঞান সম্পর্কিত ধারণা।

রাগ নিয়ন্ত্রণ করার মতো ক্ষমতা। পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুধাবনের যোগ্যতা। সেই সাথে তাঁর থাকতে হবে এমন সুন্দর একটা মন, যে মনের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে আলোকিত হয় শিক্ষার্থীদের মন। তাইতো আমি বারবার বলি, নিয়োগপত্র পেলেই শিক্ষক হওয়া যায় না, শিক্ষক হয়ে উঠতে হয়। চেহারা ভালো হলেই সুন্দর হওয়া যায় না, সুন্দর হয়ে উঠতে হয়। তবেই শিক্ষক হয়ে ওঠেন অনুকরণীয় অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। সেই শিক্ষককে অনুসরণ করে শিক্ষার্থীরা হয়ে ওঠে আদর্শ মানুষ। চিরদিন পরিপাটি থাকে তাদের সাজপোশাক, চুল ও চালচলন। এটিই হচ্ছে আচরণের স্থায়ী অনুকূল পরিবর্তন, এটিই হচ্ছে শিক্ষা। হয়ত এমন শিক্ষা দিতে পারেননি বলেই ম্যাডামের ব্যক্তিত্বের প্রভাবে বা তাঁকে খুশি করার আশায় বা তাঁর মুখের ভাষায় সেচ্ছায় চুল ছোট করেনি তাঁর শিক্ষার্থীরা। এই ব্যর্থতা ফারহানা ইয়াসমিন বাতেনের একার নয়। তাঁর ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ ভিন্ন। এমন অনেক ব্যর্থতা আমার এবং আমাদের অনেকেরই আছে। কেননা, শিক্ষক হিসেবে আমি ব্যর্থ হয়েছি। অভিভাবক হিসেবে আমি ব্যর্থ হয়েছি। প্রশাসক হিসেবে আমি ব্যর্থ হয়েছি। 

আসলে চুল ছোট থাকবে না বড় থাকবে, জামা কাল থাকবে না সাদা থাকবে, সেটি বড় বিষয় নয়। পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি রাখা বা থাকাই বড় কথা। আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ বিশ্বের দেশে দেশে বিভিন্ন পেশার অনেক গুণী মানুষেরা লম্বা চুল রেখেছেন এবং রাখছেন। বিভিন্ন ধর্মযাজকদেরও দেখা গেছে লম্বা চুল। আবার খাটো চুলেও ইদানিং দেখা যায় অনেক বিশ্রী কাটিং! টিকটিকি বা গিরগিটি কাটিং করে চুলে রং দিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় অনেক তরুণ! অবশ্যই সমর্থনযোগ্য নয় এইরূপ বিশ্রী কাটিংয়ের ছোট চুল। এই তরুণদের বিকৃত মানসিকতার দায় তাদের বাবা-মা ও শিক্ষকসহ আমাদের সকলের। আমরা কেউ এগিয়ে আসি না। ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার এগিয়ে আসার কৌশলটি ছিল অশিক্ষক সুলভ  ত্রুটিপূর্ণ, অসুন্দর, অপরিপক্ক ও বিধি বহির্ভূত। বিশেষ করে পূর্বপরিকল্পিত ভাবে নিজে কাঁচি নিয়ে পরীক্ষা হলের প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে পরীক্ষার্থীদের চুল কেটে দেওয়া মেনে নেওয়া যায় না কোন যুক্তিতেই। এতে শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সুন্দর চেহারা ও অমায়িক হাসির আন্তরিক প্রতিফলন ঘটেনি। শিক্ষার্থীদের মনে আঘাত দেওয়া হয়েছে। তাদের পরীক্ষার প্রস্তুতি লণ্ডভণ্ড করা হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ তৈরি করা হয়েছে। অপমানে আত্মহত্যা করার মতো মনের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে। তাই তিনি বিতর্কিত ও সমালোচিত হয়েছেন। তিরস্কার করেছি আমরা অনেকেই। তাঁকে আনা হয়েছে শাস্তির আওতায়। বিষয়টি গড়িয়েছে হাইকোর্ট পর্যন্ত। এটিও এখন আমাদের কষ্টের কারণ হয়েছে! তিনি কঠোর শাস্তি পাক, শিক্ষকতা থেকে বিতাড়িত হোক, তাঁর হাসিমাখা মুখ মলিন হোক এটিও মেনে নিতে পারছি না আমরা!

ফারহানা ইয়াসমিন নিশ্চয়ই বুঝেছেন মোটেও ঠিক হয়নি তাঁর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন নিষ্ঠুর আচরণ! উদ্দেশ্য সৎ হলেও সঠিক ছিল না বাস্তবায়ন কৌশল। মানুষ ঠেকে শিখে। এবার ঠেকে তিনিও হয়তো শিখেছেন অনেক কিছু। হয়তো চিনেছেন শত্রু-মিত্র। যে কাজের জন্য তিনি আজ এত তিরস্কৃত সে কাজ থেকে তাকে নিবৃত রাখার মতো কেউ সেখানে ছিলেন কিনা, থেকে থাকলে যথাযথ চেষ্টা করেছিলেন কিনা, জানি না। একটা পরিবারেও কেউ অতি ইমোশনাল হয়ে বা ক্ষুব্ধ হয়ে সন্তানকে কঠিন শাসন করলে অন্য একজন তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। সেক্ষেত্রেও উভয়ের থাকে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের প্রতি আমরা দেখতে পাইনি তেমন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ফারহানা ইয়াসমিনকে বলব, সন্তানের কাছে, শিক্ষার্থীর কাছে, হেরে যাওয়া বলতে কিছু নেই। তারা ভুল বুঝতে পারে, তাদের কেউ ভুল বুঝাতে পারে। আমরা শিক্ষক, আমাদের দ্বারা শিক্ষার্থীর বিন্দুমাত্র ক্ষতি কাম্য নয়। এমনকি অভিশপ্ত করাও উচিত নয়। রাগ-অভিমান ভুলে যান। সকল সৌন্দর্য অন্তরে ধারণ করুন। শিক্ষার্থীদের কাছে ডাকুন। রাগের সুরে নয়, সোহাগের সুরে কথা বলুন। তাদের বুঝতে দিন, আপনি আসলেই তাদের আদর করেন, স্নেহ করেন, ভালোবাসেন, ভালো চান। তাদের যে পরীক্ষা ভালো হয়নি সে পরীক্ষায় ভালো করার সুযোগ দিন। নিশ্চয়ই তারা ভুলে যাবে তাদের মনের কষ্ট। আপনার প্রতি শ্রদ্ধায় ভরে উঠবে তাদের মন। আপনার প্রতি থাকবে না তাদের অভিযোগ। 

প্রিয় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বৃন্দ, তোমরা বড় হয়েছ। নিজের ভালো-মন্দ অবশ্যই বুঝ। অল্পতেই ভেঙে পড়লে চলবে না। আত্মহত্যা করা মানে চিরদিনের জন্য হেরে যাওয়া। হাজারো প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে অনেক দূর। তোমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিশুদ্ধ করার দায়িত্ব তোমাদের। জাতীয় ও ধর্মীয় ঐতিহ্য লালন পালন করার দায়িত্ব তোমাদের। ছোটরা তোমাদের অনুসরণ করে। কিসে তোমাদের প্রতি ছোটদের শ্রদ্ধা বাড়বে তা তোমরা বুঝবে আশা করি। মাত্র তো প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তোমরা। আরো অনেক দিন থাকবে তোমাদের প্রিয় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিশ্চয়ই এই কষ্ট ভুলে যাবে একদিন। বড় হয়ে যাবে তোমাদের চুল। তোমরা হয়ে উঠবে ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ। আবার মেতে উঠবে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। হয়তো সেদিন থাকবে না তোমাদের শিক্ষক ফারহানা ইয়াসমিন। হয়তো থাকবে না তার এই সুন্দর হাসিমাখা মুখ। হয়তো একদিন তোমরাও হয়ে উঠবে অনুতপ্ত। এমনও হতে পারে, যখন তোমাদের মতো বড় হবে তোমাদের সন্তান তখন আবার মনে পড়বে এই ফারহানা ম্যাডামের কথা। মনে রেখো, বাবা-মা ও শিক্ষকের ভুল থাকে, অপরাধ থাকে না সাধারণত।

মা-বাবা ও শিক্ষকের ভুল মনে ধরে চির কল্যাণ হয় না সন্তানের, শিক্ষার্থীর। শিক্ষকের ভুল বা অপরাধ ক্ষমাযোগ্য হলে তা ভুলে গিয়ে শিক্ষার্থী চির দিনের জন্য হয়ে উঠতে পারে উত্তম। বল এখন তোমাদের কোটে। কারো দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে ভেবে দেখো একান্তে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে কোন একদিন নিশ্চয়ই এই ম্যাডাম আদর করেছিলেন তোমাদের। নিশ্চয়ই শিখিয়েছেন পাঠ্যবইয়ের কোন একটি অধ্যায়। ঠিক ততো টুকুর জন্য হলেও তিনি তোমাদের শিক্ষক। তোমাদের শিক্ষকের বিরুদ্ধে তোমাদের ব্যবহার করে কেউ যেন হাসিল করতে না পারে অন্য কোন স্বার্থ! মনে রেখো, বাবা-মা ও শিক্ষককে পাল্টা আঘাত করতে হয় না পারতপক্ষে। তোমরা তোমাদের রুদ্রমূর্তি পরিত্যাগ করে শিক্ষকের সামনে গিয়ে দাঁড়াও। তিনিই ভুলিয়ে দিবেন তোমাদের সকল কষ্ট। একমাত্র তিনিই করতে পারেন তোমাদের মনোকষ্টের চিরস্থায়ী অবসান। একমাত্র তোমরাই তাঁকে নামিয়ে আনতে পারো বিচারের কাঠগড়া থেকে। শিক্ষকের সাথে তোমাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানেই বিদ্যমান উভয়ের কল্যাণ এবং সকলের স্বস্তি। 

লেখক :  মো. রহমত উল্লাহ্, অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা। 

শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর দাবিতে পার্লামেন্টে শিক্ষার্থীরা - dainik shiksha শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর দাবিতে পার্লামেন্টে শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে এ মুহূর্তে ক্লাস বাড়ানোর সুযোগ নেই : শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha স্কুল-কলেজে এ মুহূর্তে ক্লাস বাড়ানোর সুযোগ নেই : শিক্ষামন্ত্রী নতুন বছরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুরোদমে ক্লাস : শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha নতুন বছরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুরোদমে ক্লাস : শিক্ষামন্ত্রী পীরগঞ্জে হামলা : র‍্যাবের হাতে আটক সৈকত ছাত্রলীগ নেতা - dainik shiksha পীরগঞ্জে হামলা : র‍্যাবের হাতে আটক সৈকত ছাত্রলীগ নেতা ছাত্রের মাকে পেটালেন শিক্ষক - dainik shiksha ছাত্রের মাকে পেটালেন শিক্ষক ছাত্রীর আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল, শিক্ষক কারাগারে - dainik shiksha ছাত্রীর আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল, শিক্ষক কারাগারে দুকুল হারালেন শিক্ষক আবু হানিফ - dainik shiksha দুকুল হারালেন শিক্ষক আবু হানিফ ‘শিক্ষকরা দক্ষ হলেই শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা দিতে পারবেন’ - dainik shiksha ‘শিক্ষকরা দক্ষ হলেই শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা দিতে পারবেন’ please click here to view dainikshiksha website