জালিয়াতি করে মেডিকেলে ভর্তি, দুই যুগ পর ধরা - ভর্তি - দৈনিকশিক্ষা

জালিয়াতি করে মেডিকেলে ভর্তি, দুই যুগ পর ধরা

নিজস্ব প্রতিবেদক |

বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ভর্তি হয়েছিলেন দিলারা বেগম। সেখান থেকে এমবিবিএস পাস করেন ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে । চিকিৎসা সনদ নিয়েই ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে স্বামীর সঙ্গে দিলারা পাড়ি জমান লন্ডনে। দীর্ঘ দুই যুগ পর ধরা পড়ল তার মেডিকেলে ভর্তির জালিয়াতি।

দিলারার ভর্তি-সংক্রান্ত নথি ও অনিয়ম বের করতে দুই বছর ধরে তদন্ত করেছে অডিট অধিদপ্তর। সেখানে উঠে আসে, পরীক্ষায় পাস না করেই মেডিকেল শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হন তিনি। একেক জায়গায় একেক নাম ও ঠিকানাও ব্যবহার করেন। পুরো শিক্ষাজীবনসহ দীর্ঘকাল বিষয়টি গোপনও থাকে। এরপর সন্দেহজনক কিছু তথ্য সামনে এলে অনুসন্ধান শুরু হয়। এরপর জালিয়াতির বিষয়টি উঠে আসার পর এরই মধ্যে তার চিকিৎসা সনদ বাতিলসহ প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে চিঠি দিয়েছে অডিট অধিদপ্তর। 

নানা জালিয়াতি করে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তি করানোর বিভিন্ন চক্র দেশে সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই চক্রের সদস্য ও যারা অবৈধভাবে বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছেন তাদের শনাক্ত করেছে। গত বছর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি এমন একাধিক চক্রকে শনাক্ত করে।

বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল থেকে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে রেজিস্ট্রেশন পান দিলারা। তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর- ৩৭৮৮৩। এসএসসির সনদ এবং মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল থেকে পাওয়া রেজিস্ট্রেশনে তার নামের অমিল রয়েছে।

সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের ১৯৯৬-৯৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভর্তি পরীক্ষায় দিলারার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছিল ডিএম ০৪২২। ডিএমের অর্থ হলো, ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ভর্তি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধিত হয়েছিলেন তিনি। তার মেধাক্রম দেখানো হয় ৯৬৭। তবে বাস্তবে এ ধরনের মেধা তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশ করা হয়নি। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ মে 'দি বাংলাদেশ অবজারভার' পত্রিকার ৭ নম্বর পৃষ্ঠায় মেডিকেল ভর্তির ফলাফল প্রকাশ হয়। দিলারার মেধাতালিকা দেওয়া হয় এসএস ০৯৬৭। সেখানে এই নম্বরটি অপেক্ষমাণ তালিকায় ৯৬ নম্বরে ছিল। তার নিবন্ধন নম্বর যেটা দেখানো হয় সেটাও আরেকজনের। সেটি হলো ডিএম ০৪২২। তদন্তে উঠে আসে, দিলারা বেগম ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে। তাই তার রেজিস্ট্রেশন নম্বরের আগে সিএম থাকার কথা।

অডিট অধিদপ্তরের তদন্ত বলছে, ভর্তি পরীক্ষায় পাস না করেই দিলারা জালিয়াতি করে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। আর তার জন্মতারিখ ও জন্মস্থান নিয়েও আছে বিভ্রান্তি। শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সময় দিলারার জন্ম সাল দেখানো হয় ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিসের রেকর্ডে তার জন্মতারিখ ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর উল্লেখ করা হয়। দিলারার ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়- ৪২৭, ঘোষাল কোয়ার্টার। অডিট অধিদপ্তর প্রশ্ন তোলে- একই ব্যক্তিকে দুটি রেজিস্ট্রেশনে দুই জন্মতারিখে কীভাবে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ ভর্তি দেখাল। যে কিনা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়ে পাস করেননি।

তদন্তে এও উঠে আসে, দিলারা বেগম তিনটি ঠিকানা দিয়ে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ভর্তির সময় তার ঠিকানা উল্লেখ করেন- গ্রাম- কাউয়াদি, পোস্ট-চরসিন্দুর, থানা-পলাশ ও জেলা-নরসিংদী। কিন্তু ওই ঠিকানায় দিলারা বেগম কখনোই ছিলেন না। এমনকি দিলারার বাবা সামশুল হুদা বা তার পরিবারের কোনো সদস্য নরসিংদীর ওই ঠিকানায় বাস করেনি। দিলারা নরসিংদীতে তার যে ঠিকানা ব্যবহার করেছেন, সেই ঠিকানায় একজন নারী চিকিৎসক রয়েছেন। তার নাম ডা. স্বপ্না রানী ধর। তিনি ১৯৯৬-৯৭ শিক্ষাবর্ষে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। পরে ন্যাশনাল মেডিকেলে ভর্তি হয়ে ডাক্তারি পাস করেন। ঢাকা মেডিকেল থেকে ডিএম-০৪২২ রেজিস্ট্রেশনধারী যিনি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শেরেবাংলা মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন তার রোলের বিপরীতেই জালিয়াতি করে দিলারাকে ভর্তি করা হয়।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা প্রশ্ন তোলেন- ওই সময় বরিশাল মেডিকেল কলেজ দিলারার রেজিস্ট্রেশনের জন্য কী কী কাগজপত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে। ভর্তি পরীক্ষা হয় ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ৪ এপ্রিল, ফল ঘোষণা হয় ১ মে। তাহলে ট্রান্সক্রিপ্টে কীভাবে তার ভর্তির তারিখ ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ এপ্রিল দেখানো হলো?

জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৯৯৬-৯৭ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নেয় ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ৪ এপ্রিল। ভর্তি ফল প্রকাশিত হয় ওই বছরের ১ মে। সেখানে কোন শিক্ষার্থী কোন মেডিকেলে ভর্তি হবেন সে অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেওয়া ছিল। জালিয়াতির এই ঘটনায় তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক পরিচালক, হিসাবরক্ষণ শাখার এক কর্মকর্তাসহ তিনজনের সংশ্নিষ্টতার তথ্য তদন্তে উঠে আসে। এই ভর্তির নেপথ্যে ওই সময় চার লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে আলামত পাওয়া গেছে।

লন্ডনের নম্বরে যোগাযোগ করেও দিলারার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে দেশে বসবাসরত দিলারার ভাই নাজমুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এতদিন পর কেন এই বিষয়টি লিখতে হবে। আমার বোন তো ডাক্তারি পাস করে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে স্বামীর সঙ্গে লন্ডনে চলে গেছে। যদি ভর্তি প্রক্রিয়ায় কোনো জালিয়াতি করেও থাকে, তাহলেও এমনকি অন্যায় করেছে। সেও ডাক্তারি পেশায় নেই। কত মানুষ আরও কত অন্যায়-অপরাধ করে যাচ্ছে সমাজে।


নাজমুল হুদা আরও বলেন, আমার দাদার বাড়ি ফেনীতে। বাবা বাড়ি করেছেন চট্টগ্রামে। নরসিংদীতে আমাদের কেউ কখনও ছিল না। তাহলে বোনের ঠিকানা কীভাবে নরসিংদীতে দেখানো হলো- এমন প্রশ্নে নিরুত্তর ছিলেন তিনি।

প্রতিরক্ষা অডিট অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাহতাব উদ্দিন বলেন, দুই বছর অনুসন্ধানের পর দিলারার মেডিকেল জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। পরীক্ষায় পাস না করেই মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলেন। তার সনদ বাতিলের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতদিন আগের নথিপত্র খুঁজে না পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনও সনদ বাতিল করতে পারেনি, এটা আমাদের জানানো হয়।

১২ মাসে বিসিএস শেষ করার ক্রাশ প্রোগ্রাম, জানালেন পিএসি চেয়ারম্যান - dainik shiksha ১২ মাসে বিসিএস শেষ করার ক্রাশ প্রোগ্রাম, জানালেন পিএসি চেয়ারম্যান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ শিগগিরই : শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ শিগগিরই : শিক্ষামন্ত্রী আশঙ্কার চেয়েও কঠিন অপপ্রয়োগ হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের - dainik shiksha আশঙ্কার চেয়েও কঠিন অপপ্রয়োগ হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অনুদানের নামে প্রতারণা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা - dainik shiksha অনুদানের নামে প্রতারণা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা করোনাকালেও দুর্নীতি, মিনিষ্ট্রি অডিট চলছে রাজধানীর ১২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে - dainik shiksha করোনাকালেও দুর্নীতি, মিনিষ্ট্রি অডিট চলছে রাজধানীর ১২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের চিন্তাভাবনা নেই : আইনমন্ত্রী - dainik shiksha ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের চিন্তাভাবনা নেই : আইনমন্ত্রী ১০ মার্চের মধ্যে সব শিক্ষককে টিকা নেয়ার নির্দেশ - dainik shiksha ১০ মার্চের মধ্যে সব শিক্ষককে টিকা নেয়ার নির্দেশ নগদের পোর্টালে উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের তথ্য অন্তর্ভুক্তি শুরু ১৫ মার্চ - dainik shiksha নগদের পোর্টালে উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের তথ্য অন্তর্ভুক্তি শুরু ১৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আবেদনের ৭ জরুরি নির্দেশনা - dainik shiksha ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আবেদনের ৭ জরুরি নির্দেশনা ৩ মাসের এমপিও হারালেন আরও ৪ প্রতিষ্ঠান প্রধান - dainik shiksha ৩ মাসের এমপিও হারালেন আরও ৪ প্রতিষ্ঠান প্রধান সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষিকাকে এমপিওভুক্তির চেষ্টা, বেতন বন্ধ হলো অধ্যক্ষের - dainik shiksha সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষিকাকে এমপিওভুক্তির চেষ্টা, বেতন বন্ধ হলো অধ্যক্ষের please click here to view dainikshiksha website