ত্যাগের অনন্য কীর্তি সাবেক আইনমন্ত্রী - বিবিধ - দৈনিকশিক্ষা

ত্যাগের অনন্য কীর্তি সাবেক আইনমন্ত্রী

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। মন্ত্রী হলে সরকারি নানা সুবিধা মেলে এটা বলাই বাহুল্য। সেখানে পাঁচ বছরে এর কোনো কিছুই স্পর্শ করেননি তিনি। সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেননি। ওঠেননি সরকারের বরাদ্দকৃত বাড়িতেও। বিদেশ সফরে মন্ত্রীদের জন্য বিশেষ সুবিধা থাকলেও তিনি চড়েছেন বিমানের সাধারণ আসনে (ইকোনমি ক্লাস)। দুপুরের খাবারের জন্য সরকারি দপ্তরের কোনো খরচ নেননি। খাবার নিয়ে আসতেন বাসা থেকে। পরিবারের সদস্যদের প্রতি নির্দেশনা ছিল, তারা কেউ পাঁচ বছর জাতীয় সংসদ ভবন ও সচিবালয়মুখো হবেন না। পাঁচ বছর মন্ত্রিত্বে থেকেও সুযোগ-সুবিধা এড়িয়ে এমন নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। শনিবার (২১ জানুয়ারি) দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন উৎপল রায়। 

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, সময়টা ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শফিক আহমেদ তখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি। আগের বছরের শেষদিকে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের অপেক্ষায়। মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবি তখন তুঙ্গে। একই সঙ্গে আপিল বিভাগে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের শেষ (পাঁচজন তখন কারাগারে) ও রায় কার্যকর দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন প্রাজ্ঞ ও বিশ্বস্ত এবং আইনে পারদর্শী একজন ব্যক্তিত্বের। কাকে এ গুরু দায়িত্ব দেওয়া যায় এ নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল তখন রীতিমতো গবেষণায় ব্যস্ত। এর কয়েক মাস আগে ব্যারিস্টার শফিক সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে কারান্তরীণ আওয়ামী লীগ সভাপতি (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনাকে মুক্ত করতে আইনি লড়াইয়ে রেখেছিলেন মুখ্য ভূমিকা।

শফিক আহমেদ বলেন, ‘আমাকে ডেকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ করা হলো। বললাম, আমি তো রাজনীতি করি না। সংসদ সদস্যও হইনি। টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব এলো। বললাম, পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ভেবে দেখি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলাম। এ জন্য রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাও হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা এবং ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের মূল সংবিধানের চেতনায় ফিরে যাওয়া আমার জীবনের স্বপ্ন। এটাই হয়তো সেই সুযোগ। কিন্তু পথটা এত সহজ ছিল না। কোনো ভুল করা চলবে না। সব চিন্তা করেই মন্ত্রিত্বের পদে আসি।’ তিনি যোগ করেন, ‘বিশেষ একটি পরিস্থিতিতে যেহেতু দায়িত্ব নিয়েছি, তাই মন্ত্রিত্বের সুবিধা নিইনি মূলত বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও দেশের মানুষের প্রতি সম্মান রেখে।’

শফিক আহমেদের ভাষায়, ‘রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক বিষয়ের সুরাহার উদ্দেশ্যে দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছিলাম। শর্তই ছিল এ জন্য কোনো বেতন ও সুবিধা নেব না। আমি কিংবা আমার পরিবার মন্ত্রিত্বের সুবিধা উপভোগ করব এমন চিন্তা করে আসেনি। জনগণ ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়। তাদের কষ্টের টাকা খরচ করতে মনে সায় দেয়নি।’

৮৬ বছর বয়সী এ মানুষটি এখন জীবনের গোধূলি বেলায় দাঁড়িয়ে। দেশের একজন প্রখ্যাত আইনজীবী ও সংবিধান বিশ্লেষক। ৫৭ বছর ধরে উচ্চ আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা থাকলেও প্রিয় কর্মস্থল সুপ্রিম কোর্টে যান মাঝেমধ্যেই। আইন ও বিচারাঙ্গনে থাকা সমস্যা নিয়ে মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে কথা বলেন। দেশের মানুষ কীভাবে দ্রুততম সময়ে বিচার পাবেন, কাউকে আদালতে দিনের পর দিন ঘুরতে হবে না, এ নিয়ে পথ বাতলে দেন।

বিশিষ্টজনরা প্রায়ই বলেন, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বিরল চরিত্রের মানুষ। ক্ষমতা, লোভ তাকে স্পর্শ করেনি কখনো। আইন, বিচারাঙ্গনের মানুষরা বলেন, নানা ক্ষেত্রে ভূমিকার জন্য শফিক আহমেদ আইনজীবী সমাজের গর্ব। তিনি আইন, সংবিধান ও কর্মক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

জ্যেষ্ঠ এ আইনজীবীকে মূল্যায়ন করে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন দেশ বলেন, ‘শফিক আহমেদ একজন বড় আইনজীবী। দেশের আইন ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় ওনার অবদান অপরিসীম। এখনো তিনি এ ভূমিকা রাখছেন। উনি যখন মন্ত্রী ছিলেন, সে সময়ে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের সময় যেভাবে তিনি অকুতোভয়ে আইনি লড়াই করেছেন তা প্রত্যেক আইনজীবীর কাছেই গর্বের বিষয়। সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় তিনি ভূমিকা রেখেছেন। শুধু তাই নয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে আইন প্রণয়ন ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়ে তার ভূমিকা জাতি অবশ্যই স্মরণে রাখবে।’

সম্প্রতি রাজধানীর ইন্দিরা রোডের বাসায় শফিক আহমেদের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তার স্ত্রী মাহফুজা খানম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি (১৯৬৬-৬৮)। ঐতিহ্যবাহী ইডেন কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। একুশে পদক ও বেগম রোকেয়া পদকজয়ী মাহফুজা খানম ঢাকা বিশ্ব^বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মেম্বার, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি, খেলাঘরের চেয়ারপারসনসহ নানা সামাজিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত। বড় ছেলে ডা. মাহফুজ শফিক, ছোট ছেলে ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক ও মেয়ে ডা. মাশরুরা শফিক নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত। প্রচারবিমুখ শফিক আহমেদ প্রচারে আসতে চান না। কিন্তু নানা কীর্তির কারণে প্রচারের আলো তাকে এখনো খুঁজে ফেরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়াটিক সোসাইটি, নটর ডেম কলেজ, ন্যাশনাল কলেজ অব হোম ইকোনমিকস, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ অন্তত ২৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত আছেন ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ও অধ্যাপক মাহফুজা খানম দম্পতি। দুজনের যৌথ নামে ২০০৩ সাল থেকে মানিকগঞ্জের (মাহফুজা খানমের গ্রামের বাড়ি) ১৫৪টি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মেধার ভিত্তিতে প্রতি বছর বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার নারায়ণপুর গ্রামে শফিক আহমেদের মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘বেগম ইয়াকুবুন্নেসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এখন জেলার সেরা প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। 

সংবিধানকে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের মূল সংবিধানের চেতনায় ফিরিয়ে নিতে না পারার আক্ষেপ আছে শফিক আহমেদের। দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন না হওয়াও পোড়ায় তাকে। তিনি বলেন, ‘আমি তো তিনটি গুরুদায়িত্বের কথা মাথায় রেখেই দায়িত্ব নিয়েছিলাম। তবে, একটি দায়িত্ব (সংবিধানকে ৭২-এ চেতনায় নিয়ে যাওয়া) পালন করতে পারিনি। এটি আরও আগেই করা উচিত ছিল। আমি আশাবাদী একটু কঠিন হলেও এটি অসম্ভব নয়। কারণটা হলো, সংবিধান একটি রাষ্ট্র ও জনগণকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। এ পথ দেখানোর মধ্যে যেন কোনো ভুলভ্রান্তি না হয়। এখন এর সঙ্গে যারা যুক্ত তারা নিশ্চয়ই সেটি বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, আইন-আদালতসহ সব ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হলে সেই উন্নতির সুফলটা রাষ্ট্রের মালিক জনগণ আরও বেশি পেত। বিচার দ্রুত নিশ্চিতে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন হলে বিচারপ্রার্থীর সুফল আসত। অপরাধও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসত।’

তিনি বলেন, ‘মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলাম। অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য চেষ্টা করেছি, অনেকটা সফলও হয়েছি। মন্ত্রী থাকতে বেতন থেকে শুরু করে কোনো সুবিধাই নিইনি। এটা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে, চাইলে সবই সম্ভব। আমি মনে করি দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য একজন রাজনীতিবিদের বা মন্ত্রীর সততাটা খুবই জরুরি এবং সেটাই করা উচিত।’

স্বামী শফিক আহমেদকে নিয়ে গর্ব করেন মাহফুজা খানম। তিনি দেশ বলেন, ‘৫০ বছরের বেশি সময় ধরে সংসার করছি। কখনো কোনো শঠতার আশ্রয় নেননি। আইন পেশায় জীবনে যে অর্থ উপার্জন করেছেন সংসার খরচ বাদে সব ব্যয় করেছেন মানুষ ও শিক্ষার কল্যাণে। যে কয়েকটি বছর মন্ত্রী ছিলেন, কোনো উপঢৌকন আসতে দেখিনি। মন্ত্রীর স্ত্রী হিসেবে আমাকে নানা সুবিধা দিতে অনেকেই এসেছিলেন। ফিরিয়ে দিয়েছি। তিনি (শফিক আহমেদ) অবাক হয়ে বলতেন, মন্ত্রীদের স্ত্রীদেরও গাড়ি-বাড়ি থাকতে হয় নাকি!’

তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রিত্বের পাঁচটি বছর একপ্রকার হুমকি ও মৃত্যু শঙ্কার মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের ঘাড় বাঁচাতে আমাকে বিধবা হওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু তিনি ছিলেন অটল।’ 

১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ অক্টোবর কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার নারায়ণপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শফিক আহমেদ। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বে সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে মেধা তালিকায় ১২তম স্থান পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে একই বিশ^বিদ্যালয় থেকে পরে আইন বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে বার অ্যাট ল ডিগ্রি নিয়ে আইন পেশায় নিয়োজিত হন তিনি।

দৈনিক শিক্ষাডটকম-এর যুগপূর্তির ম্যাগাজিনে লেখা আহ্বান - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষাডটকম-এর যুগপূর্তির ম্যাগাজিনে লেখা আহ্বান ৫০ প্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করেনি - dainik shiksha ৫০ প্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করেনি ১ হাজার ৩৩০ প্রতিষ্ঠানে সবাই পাস - dainik shiksha ১ হাজার ৩৩০ প্রতিষ্ঠানে সবাই পাস পৌনে দুই লাখ জিপিএ-৫ - dainik shiksha পৌনে দুই লাখ জিপিএ-৫ এইচএসসির ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন যেভাবে - dainik shiksha এইচএসসির ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন যেভাবে এইচএসসি বিএম-ভোকেশনালে পাসের হার ৯৪ শতাংশের বেশি, ৭ হাজার ১০৪ জিপিএ-৫ - dainik shiksha এইচএসসি বিএম-ভোকেশনালে পাসের হার ৯৪ শতাংশের বেশি, ৭ হাজার ১০৪ জিপিএ-৫ আলিমে পাসের হার ৯২ শতাংশের বেশি, সাড়ে ৯ হাজার জিপিএ-৫ - dainik shiksha আলিমে পাসের হার ৯২ শতাংশের বেশি, সাড়ে ৯ হাজার জিপিএ-৫ শুধু এইচএসসিতে পাসের হার ৮৪ দশমিক ৩১ শতাংশ - dainik shiksha শুধু এইচএসসিতে পাসের হার ৮৪ দশমিক ৩১ শতাংশ please click here to view dainikshiksha website Execution time: 0.0038168430328369