প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা যাচাই - শিক্ষাবিদের কলাম - দৈনিকশিক্ষা

প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা যাচাই

মাছুম বিল্লাহ |

গুণগত ও মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষাই পরবর্তী শিক্ষার মূলভিত্তি। প্রাথমিক শিক্ষায় একজন শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের সঠিক নির্দেশনা বা পরিচর্যার মাধ্যমে তাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করেন। একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের আনন্দের সঙ্গে বিভিন্ন কলাকৌশল ব্যবহার করে সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহযোগিতা করেন। সময়ের আবর্তে শিক্ষকই শিক্ষার্থীর তথা একটি জাতির পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করেন। একজন শিক্ষকের প্রথম কাজই হচেছ, একটি শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীকে কার্যকরভাবে শ্রেণিকার্যক্রমে অংশগ্রহণ করানো এবং আনন্দময় পাঠদান করা ও সকল শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। নিরাপদ পরিবেশ বলতে কোন শিক্ষার্থী যাতে অন্য শিক্ষার্থী কর্তৃক তিরস্কৃত কিংবা হাসির পাত্রে পরিণত না হয়। সে যা বলতে চায়-তা বলার সুযোগ করে দেওয়া। পাঠদানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করানোই হচেছ শিক্ষকের কাজ। শিক্ষকের বাবা কৃষক বা অসচেতন তাই পড়া পারেনা এগুলো বলার জন্য নয়। একজন  শিক্ষক তার মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন গবেষণা পদ্ধতি আবিষ্কার করবেন এবং তা শ্রেণিপাঠে প্রয়োগ করবেন। একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়, এর বাইরেও সামাজিক, সাংস্কৃতি ও নৈতিকতা শিক্ষা দেবেন।

গত ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের  এক অনুষ্ঠানে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের অদক্ষতার বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন  প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব (সম্প্রতি যাকে বদলি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে)। তিনি বলেন, মানসম্মত শিক্ষা প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শুরু করতে হবে। সরকার শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন, এর সঙ্গে কর্তব্য ও কাজকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবেনা। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকের শিক্ষকরাই বই পড়েন না। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হলে তাদের অবশ্যই পড়তে হবে এবং  শিখতে হবে। যারা একাডেমিক সুপারভিশনে যান, তারাও বই পড়েন না। ”তিনি প্রাথমিক শিক্ষকের ইমেজ পুনঃনির্মাণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, শিক্ষকদের শিখন দক্ষতা থাকতে হবে। তাদের ব্যর্থতার দায় নিতে হবে। ব্যর্থতাকে অদক্ষতা হিসেবে আখ্যায়িত করে শাস্তির আওতায় আনা হবে। সবাইকে ঘুরে দাঁড়ানোর শপথ নিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার মান সার্বিকভাবে খুব বেশি ভাল না বলে মন্তব্য করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ অন্য একজন কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন স্কুল পরিদর্শন করে দেখা গেছে-শিক্ষকরাও অনেক সহজ ইংরেজি বানান জানেন না, ইংরেজি পড়াতে স্বাচছন্দ্যবোধ করেন না। অনেক শিক্ষক বাংলাও ঠিকমতো পড়াতে পারেন না। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিছু শিক্ষার্থী নিজ আগ্রহে এবং কিছু অভিভাবকের প্রচেষ্টায় পড়ালেখায় ভাল করছেন। 

উপরোক্ত আলোচনা ও বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা যাচাই কার্যক্রম শুরু করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ২৯ আগস্ট প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব ঢাকা থেকে রংপুর সদর উপজেলার রঘু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফকরকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের  সঙ্গে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শিখন দক্ষতা যাচাই কার্যক্রম শুরু করেন। শিশুদের শিখন দক্ষতা যাচাইকালে তাদের মেধা, দক্ষতা, মনোযোগ, আগ্রহ, কৌতূহল, প্রভৃতি বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং তাদের গাণিতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ের সমাধান করতে দেন। বাস্তবভিত্তিক ও অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ শুরু করেছেন মাননীয় সচিব। কারণ বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে যে চিত্রটি লক্ষ্য করা যায় তা হচ্ছে ভর্তিকৃত সব শিশু প্রতিদিন উপস্থিত হয় না। কদাচিত কোন বিদ্যালয়ে মাত্র একটি বা দুটি শ্রেণিতে সব শিশুদের উপস্থিত পাওয়া যায়। যে শিক্ষার্থীরা অনুপস্থিত তাদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তেমন তাগিদ চোখে পড়ে না। অথচ শিক্ষার্থীদের শতভাগ হাজিরা নিশ্চিত করতে স্কুলের ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক হোমভিজিট, মা-সমাবেশ, উঠান-বৈঠক, মোবাইল ফোনে খোঁজ-খবর নেওয়া ইত্যাদি পদ্ধতি অবলম্বনের বিধান রয়েছে। এসব ব্যাপারে শিক্ষকদের প্রশ্ন করা হলে সাধারণত যে উত্তরগুলো আসে সেগুলো হচেছ- ‘শিশু বাড়িতে পড়তে পারে না, তাদের অভিভাবক নিরক্ষর, অসচেতন, বিবাহ-বিচেছদ প্রাপ্ত দপ্ততির সন্তান, হতদরিদ্র বলে কৃষিকাজ করতে যায়, মেধা অনেক কম বা করোনার সময় অন্যত্র চলে গিয়েছিল ইত্যাদি। শিশুদের প্রতি যে কোন ধরনের ঋণাত্মক  মনোভাব বদলানো জরুরি। কারণ, এই শিশুরাই আগামীর বাংলাদেশ। ২০২২-র আগস্ট মাসে সপ্তাহব্যাপী পর্যবেক্ষণ করে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধিরা দেখেছেন যে, গফরগাঁওয়ের অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশের বেশি নয়। কোথাও কোথাও একজন, দুজন শিক্ষার্থী নিয়েই ক্লাস পাঠদান চলছে।  কোন কোন শ্রেণিতে একজন শিক্ষার্থীও উপস্থিত ছিলেন না। একটি বিদ্যালয়ে কাগজে কলমে ১২৯ জন শিক্ষার্থী থাকলেও তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম এই তিন শ্রেণিতে মোট উপস্থিতির সংখ্যা ছিল ১৩। কোথাও ১১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১০ জন। শিক্ষকদের সংখ্যাও এমন পাওয়া গেছে। একটি বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষকের পদ থাকলেও তিনটি পদই শূন্য। পর্যবেক্ষণের দিন একজন মাত্র শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ে। ঐ একজন শিক্ষক তিনটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসিয়ে  পড়াচিছলেন।

আমরা জানি, শ্রেণিকক্ষে ন্যূনতম সংখ্যক শিক্ষার্থী না থাকলে এক-দুজনের ক্লাস অনেক সময় ফলপ্রসূ হয় না। আর্থিক অনিয়মের বিষয় ধরা পড়েছে অনেক বিদ্যালয়ে।  শিক্ষা উপকরণ না কেনা, কাজ না করে টাকা তোলা ইত্যাদি বিষয় ধরা পড়েছে। বরাদ্দ নেই যে খাতে সেই খাতে অর্থ খরচ। বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ দখল হয়ে যাওয়া বা বেদখল। কয়েকটি বিদ্যালয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে যে, বিদ্যালয়ের খেলার মাঠকে বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। শিশুদের খেলাধুলার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে মাঠ থাকতে হবে। প্রতিবেদনে আরও দেখা যায় যে, কিছু শিক্ষার্থী পড়ছে কেজি স্কুলে ভাল ফলাফলের জন্য কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও নাম আছে বৃত্তি পাওয়ার জন্য। এসব  পরিস্থিতিতে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নিচেছ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা যাচাই কার্যক্রম শুরুা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষক ঘাটতি পূরণে স্বচছতার সঙ্গে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও অনলাইনে বদলি কার্যক্রম চালু, শিক্ষকদের শিখন দক্ষতায় ব্যর্থতার জন্য শাস্তির আওতায় আনা এবং শিক্ষক ও পরিদর্শকদেরও পড়ালেখার প্রতি গুরুত্বারোপ করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। 

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণে এগিয়ে থাকলেও মানে যথেষ্ট পিছিয়ে। প্রাথমিকের এগার বছরে বাংলাদেশের শিশুরা যা শিখে, তা অন্য দেশের শিশুরা শিখছে সাড়ে ছয় বছরে। তৃতীয় শ্রেণির শিশুদের বাংলা পাঠের অবস্থা খুবই করুণ। তাদের ৬৫ শতাংশ বাংলা পড়তে পারে না। তৃতীয় শ্রেণির ৩৫ শতাংশ শিশু কোন রকম বাংলা পড়তে পারে। আবার পঞ্চম শ্রেণি পাস শিশুরা গণিতের মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। মাত্র ২৫ ভাগ নিজ শ্রেণির উপযোগী গণিতে সমাধান করতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মসূচির অভাবে এ অবস্থা। এ ছাড়া শিক্ষা পদ্ধতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও গণশিক্ষায় অপর্যাপ্ততার কারণেও মান বাড়ছে না। এসব বিষয় ‘লার্নিং টু রিয়ালাইজ এডুকেশনস প্রমিজ’ নামক বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জেনেছি। অবস্থা দু একটি এলাকায় কিছু নতুন ও তরুণ শিক্ষক কিংবা শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টায় পরিবর্তন হলেও পুরো দেশের চিত্র কিন্তু খুব একটা পাল্টায়নি। প্রয়োজন সঠিক উদ্যোগের এবং মাননীয় সচিব যে কাজটি শুরু করেছেন সেটি যদি পরবর্তী কর্মকর্তারা চালিয়ে যেতে থাকেন তাহলে কিছু পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সচিব বদলি হওয়ার সাথে সাথে যদি সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যায় তাহলে পরিবর্তনটি কিভাবে আসবে? এটি একটি আনন্দের সংবাদ যে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পাস করা অনেক মেধাবী তরুণী প্রাথমিক শিক্ষায় যোগদান করেছেন। আমার সংগঠনের কারণে এ ধরনের অনেক শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে সরাসরি কথা হয়, তাদের কারুর কারুর আগ্রহ ও ডেডিকেশন দেখে আমি আশান্বিত হই যে, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ঠিকই এগিয়ে যাবে। তবে, অধিকাংশ তরুণ শিক্ষক শিক্ষিকাদের এ ধরনের মনোভাব পোষণ করতে হবে, বাস্তবে নিজের অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টায় নিয়োজিত থাকতে হবে। তবেই, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের কাছাকাছি আমরা চলে যেতে পারবো।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)

কর্মসূচির নামে মানুষের ওপর হামলা হলে ছাড়বো না - dainik shiksha কর্মসূচির নামে মানুষের ওপর হামলা হলে ছাড়বো না বিশ্বকাপে সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত বাংলাদেশের - dainik shiksha বিশ্বকাপে সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ফল প্রকাশ নিয়ে যা জানা গেল - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ফল প্রকাশ নিয়ে যা জানা গেল প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ‘গুসি শান্তি’ পুরস্কার পেলেন শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha ‘গুসি শান্তি’ পুরস্কার পেলেন শিক্ষামন্ত্রী স্কুল সরকারি বেতন-ফি বেসরকারি - dainik shiksha স্কুল সরকারি বেতন-ফি বেসরকারি দশ বছরেও ৩য় বর্ষে আছেন ছাত্রলীগ নেত্রী তিলোত্তমা - dainik shiksha দশ বছরেও ৩য় বর্ষে আছেন ছাত্রলীগ নেত্রী তিলোত্তমা please click here to view dainikshiksha website Execution time: 0.0037200450897217