বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বঙ্গবন্ধুর ভাবনা - দৈনিকশিক্ষা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বঙ্গবন্ধুর ভাবনা

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

১৯৪৭ সাল থেকে এই ভূ-খণ্ডে যত রকমের প্রতিবাদ ও সংগ্রামের ঘটনা ঘটেছে, বঙ্গবন্ধু সেগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন। তিনি নিজেকে ছাত্র আন্দোলন ও শিক্ষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে কখনো দূরে রাখেননি। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, পাকিস্তান আমলে নানা রকম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি এ দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিবাদে এদেশের ছাত্র-জনতা বারবার শেখ মুজিবের নেতৃত্বে রাজপথে আন্দোলন করেছে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মোট ছয়টি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। ১৯৫২ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ শিক্ষা কমিশন, ১৯৫৭ সালে আতাউর রহমান খান শিক্ষা কমিশন, ১৯৫৯ সালে এস এম শরীফ শিক্ষা কমিশন, ১৯৬৪ সালে বিচারপতি হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন, ১৯৬৯ সালে এস এম নূর খান শিক্ষা কমিশন এবং ১৯৭০ সালে শামসুল হক শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। এই শিক্ষা কমিশন দেশকে কার্যকর কোনো শিক্ষাব্যবস্থা দিতে পারেনি। বরং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শিক্ষা বিষয়ে তাদের বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে বাংলার মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। তবে বাংলার মানুষ আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করেছে।  মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানা যায়। 

নিবন্ধে আরও জানা যায়, শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার রূপায়ণের ও ভবিষ্যত্ সমাজ নির্মাণের হাতিয়ার। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার সঙ্গে নিরক্ষরতার যদি তুলনামূলক আলোচনা করা যায়, তাহলে বলতেই হবে শিক্ষিত জাতিই একটি পরাধীন দেশকে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, নিরক্ষর জনগোষ্ঠী কখনো কোনো পরাধীন দেশকে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে নেওয়ার নেতৃত্ব দিতে পারে না। শিক্ষার সঙ্গে দেশপ্রেম কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভালো করেই জানতেন জাতিকে শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে জাতির মুক্তি নেই।

পাকিস্তান সরকার দীর্ঘ ২৩ বছরের শাসনকালে শিক্ষার জন্য কোনো নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশের শাসনভার হাতে নেওয়ার মাত্র ৯ মাসের মধ্যে ‘খুদা শিক্ষা কমিশনে’র মাধ্যমে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত একটি শিক্ষানীতি জাতিকে উপহার দিতে সমর্থ হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখে ‘খুদা শিক্ষা কমিশনে’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। ভূমিকায় বলা হয়েছে—বর্তমান শিক্ষায় নানাবিধ অভাব ও ত্রুটি বিচ্যুতি দূরীকরণ, শিক্ষার মাধ্যমে সুষ্ঠু জাতি গঠনের নির্দেশ দান এবং দেশকে আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান করার পথ নির্দেশের উদ্দেশ্যেই সরকার এ কমিশন নিয়োগ করেন। ৩০ মে, ১৯৭৪ তারিখে ৩৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত ৪৩০ পৃষ্ঠার (মুদ্রিত) এ রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা পুরোটাই প্রতিফলিত হয়েছে কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে।

দীর্ঘ মেয়াদে ও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে, সে কথা মাথায় রেখে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে ড. মুহম্মদ কুদরাত-ই-খুদাকে প্রধান করে যে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন, ১৯৭৪ সালের মে মাসে এই কমিশন বঙ্গবন্ধুর কাছে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপোর্টের পাতায় পাতায় ছিল বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনাই প্রতিফলিত হয়েছে খুদা শিক্ষা কমিশনে। বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক রিপোর্টটি গৃহীত ও অনুমোদিত হয়েছিল। বলা যায়, এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনার সার-সংক্ষেপ এখানে তুলে ধরা হলো। বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন— ১. শিক্ষায় সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ২. শিক্ষার ব্যয়ভার মূলত সরকারকেই বহন করতে হবে। ৩. ছাত্রছাত্রীদের চরিত্র গঠন, তাদের মধ্যে দেশপ্রেম সৃষ্টি এবং তাদের মানবতাবাদে উদ্বুদ্ধ করতে শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ৪. শিক্ষাদানের মাধ্যম হতে হবে মূলত মাতৃভাষা, অর্থাত্ বাংলা ভাষা। ৫. শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে। ৬. বিজ্ঞান, কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। ৭. শিক্ষায় ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শুরুতে দেশের মোট জাতীয় আয়ের শতকরা ৫ ভাগ এবং ভবিষ্যতে তা ৭ ভাগে উন্নীত করতে হবে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুই প্রথম শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করেন। তিনি প্রায় ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ লাখ ৬২ হাজার শিক্ষককে জাতীয়করণের অনুমতি দিলে অর্থমন্ত্রী অর্থসংকটের কথা বলেন। তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার সোনার বাংলা’ গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। শিক্ষকরা হলেন ‘সোনার মানুষ’ গড়ার কারিগর। শিক্ষকদের পেটে ক্ষুধা রেখে সোনার মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। যেখান থেকে পারো, টাকার ব্যবস্থা করো। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে হবে। মানুষ যখন অশিক্ষিত হয়ে থাকে, তখন সে জাতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আর মানুষ যখন শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে, তখন সে মানবসম্পদে পরিণত হয়।’

বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি করা সম্ভব নয়। তার ভাষায়—‘শিক্ষা হচ্ছে বড়ো অস্ত্র, যা যে কোনো দেশকে বদলে দিতে পারে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলতেন—জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদবিহীন দেশ শুধু মানবসম্পদ সৃষ্টি করে যদি উন্নত দেশ হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশও একদিন উন্নত দেশ হবে। আর সে জন্যই তিনি নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার সেই সব উদ্যোগের কিছু ছিল তাত্ক্ষণিক আর কিছু ছিল দীর্ঘমেয়াদি।

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হতে না হতেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দুর্ভাগ্যক্রমে স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্রকারীদের এক চক্রের হাতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে শুরু হয় সামরিক শাসন। জেনারেল জিয়া শাসনক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ১৯৭২ সালের সংবিধান যেমন স্থগিত করে দেয়, পাশাপাশি ’৭২ সালের সংবিধানের আলোকে বঙ্গবন্ধু দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিলেন, সেই শিক্ষাব্যবস্থাকেও স্থগিত করে দেওয়া হয়। ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বলা যেতে পারে পাকিস্তানি ধারায় ফিরে যায়। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ নতুন শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে মহাবিপদের মুখে ঠেলে দেয়। পাকিস্তান আমলের শিক্ষাব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্র করা হয়। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনাকে পুনরায় কার্যকরের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। দেশরত্ন শেখ হাসিনার ২০১০ সালের শিক্ষানীতির মধ্যে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনার ব্যাপক প্রতিফলন ঘটেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনকের স্বপ্নের ‘সোনার দেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ভিশন ২০২১, ভিশন ২০৪১ এবং সর্বশেষ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ ঘোষণা করেছেন এবং প্রতিটি ভিশন সফলভাবে বাস্তবায়নে শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা জাতিকে পথ দেখাবে।

লেখক : প্রফেসর ড. আবদুল খালেক, সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

শনিবার থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা - dainik shiksha শনিবার থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রোববার থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা - dainik shiksha রোববার থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা ট্রেনে কাটা পড়ে স্কুলশিক্ষকের মৃত্যু - dainik shiksha ট্রেনে কাটা পড়ে স্কুলশিক্ষকের মৃত্যু গুচ্ছের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা কাল - dainik shiksha গুচ্ছের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা কাল শিক্ষকরাই স্মার্ট নাগরিক গড়ার কারিগর: শিল্পমন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষকরাই স্মার্ট নাগরিক গড়ার কারিগর: শিল্পমন্ত্রী এনটিআরসিএর সার্টিফিকেট সংশোধনের নতুন নির্দেশনা - dainik shiksha এনটিআরসিএর সার্টিফিকেট সংশোধনের নতুন নির্দেশনা মর্নিং স্কুলের ছয় সুবিধা উল্লেখ করলেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা - dainik shiksha মর্নিং স্কুলের ছয় সুবিধা উল্লেখ করলেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দেড় মাস পর ক্লাসে ফিরছেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা, স্থগিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা - dainik shiksha দেড় মাস পর ক্লাসে ফিরছেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা, স্থগিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলের সংখ্যা বাড়াতে চায় সরকার - dainik shiksha অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলের সংখ্যা বাড়াতে চায় সরকার দৈনিক শিক্ষার নামে একাধিক ভুয়া পেজ-গ্রুপ ফেসবুকে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষার নামে একাধিক ভুয়া পেজ-গ্রুপ ফেসবুকে কওমি মাদরাসা : একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা গ্রন্থটি এখন বাজারে - dainik shiksha কওমি মাদরাসা : একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা গ্রন্থটি এখন বাজারে please click here to view dainikshiksha website Execution time: 0.0057229995727539