মাদকে আসক্তি বাড়ছে শিক্ষার্থীদের - কলেজ - দৈনিকশিক্ষা

মাদকে আসক্তি বাড়ছে শিক্ষার্থীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক |

দেশে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও মাদকে আসক্তিও ঝোঁক বাড়ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী, এমনকি উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেও বাড়ছে মাদকাসক্তের হার। একই সঙ্গে গাড়ির চালকদেরও মাদকে ডুবে থাকার প্রবণতা বাড়ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পাঁচ বছরের বার্ষিক মাদকবিষয়ক সমীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রসহ ডিএনসির চারটি সরকারি কেন্দ্রে ২০২০ সালে মোট ১৪ হাজার ৯৫২ জন এবং ৩৭০টি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রে ১৫ হাজার ১৮১ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছিলেন। আগের চার বছরও গড়ে প্রায় ৩০ হাজার করে রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকে আসক্ত রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে ডিএনসি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ডোপ টেস্টের মাধ্যমে চালক ও শিক্ষার্থীদের নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গঠন করা হচ্ছে মাদকবিরোধী কমিটি। করোনার ছুটি শেষে স্কুল-কলেজ খোলার পর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।

ডিএনসির সমীক্ষায় দেখা যায়, গেল বছর ১৫ বছরের নিচে মাদকাসক্ত শিশু ছিল ৪.৫৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে এই বয়সের রোগীর হার ছিল ৪.৪৪ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৩.৩৯ শতাংশ, ২০১৭ সালে ২.৩১ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ছিল ২.৫৮ শতাংশ। ১৬ থেকে ২০ বছরের উঠতি বয়সীদের হার গত বছর ছিল ১৭.২৬ শতাংশ। ২০১৯ সালে ছিল ২২.৭০ শতাংশ, ২০১৮ সালে ২২.৩১ শতাংশ, ২০১৭ সালে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ২০.৬৫ শতাংশ। গত বছর সবচেয়ে বেশি আসক্ত ছিল ২১ থেকে ২৫ বছরের তরুণ, যা ২৫.৮৯ শতাংশ। এই বয়সে ২০১৯ সালে ছিল ১৬.৭২ শতাংশ, ২০১৮ সালে ২০.৭২ শতাংশ, ২০১৭ সালে ১৯.২৩ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ১৮.৯৭ শতাংশ। ১৫ বছরের নিচে শিশুদের আসক্তির হার কম থাকলেও তা প্রতিবছর বেড়েই চলেছে।

বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ১০ লাখ পথশিশুর বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাদকে আসক্ত। ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পট রয়েছে, যেখানে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে। পথশিশুরা সাধারণত গাঁজা, ড্যান্ডি, পলিথিনের মধ্যে গামবেল্ডিং দিয়ে এবং পেট্রল শুঁকে নেশা করে।

ডিএনসির প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, মাদকাসক্তদের বেশির ভাগই অশিক্ষিত হলেও শিক্ষিতদের মধ্যে আসক্তির হার বেড়েই চলেছে। সে ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েই বেশি। গত বছর আসক্তদের মধ্যে ১০ বছরের শিক্ষাজীবন বা স্কুলের গণ্ডি পেরোতেই মাদকে আসক্ত হয় ২০.৩০ শতাংশ। এই পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ২০১৯ সালে আসক্ত হয়েছে ১৭.৫৮ শতাংশ, ২০১৮ সালে ১২.২৭ শতাংশ, ২০১৭ সালে ১৩.৮৫ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ১৬.১৩ শতাংশ। শিক্ষাজীবনের ১০-১২ বছর, অর্থাৎ কলেজ পর্যন্ত পড়েছেন এমন আসক্ত গত বছর ছিল ১০.৬৬ শতাংশ, ২০১৯ সালে ছিল ৯.৯০ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৮.৫ শতাংশ, ২০১৭ সালে ১২.৬২ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ৯.২৭ শতাংশ। গত বছরও মাদকাসক্তদের মধ্যে অশিক্ষিতদের সংখ্যা বেশি থাকলেও আগের বছরগুলোর চেয়ে কমতে দেখা গেছে। গত বছর অশিক্ষিত ছিল ২৫.৩৮ শতাংশ, ২০১৯ সালে ছিল ৩৬.৩৫ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৪৩.৪৬ শতাংশ, ২০১৭ সালে ২৩.৫৪ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ১৮.২৮ শতাংশ। উল্টোদিকে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে মাদকাসক্তির হার বাড়ছে। ১৩-১৪ বছর অর্থাৎ স্নাতক পর্যন্ত পড়েছেন এমন আসক্তের হার ছিল ৩.৫৫ শতাংশ, ২০১৯ সালে ছিল ১.৮৮ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৩.৪২ শতাংশ।

১৫ বছরের বেশি অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন এমন মাদকাসক্তের হার গত বছর ছিল ৪.৪ শতাংশ, ২০১৯ সালে ছিল ৩.৫৮ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ছিল ৩.৬২ শতাংশ।

ডিএনসি সূত্র জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক মাদক কারবারের কারণে শিক্ষার্থীদের আসক্তি বাড়ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তালিকায় দেখা যায়, ৩৬টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আটটি কলেজের ছাত্র, কর্মী ও প্রশাসনের ৪৬৯ জন মাদক কারবারে জড়িত। ২০১৮ সালে অভিযান শুরু হলে কারবারিদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয় এবং অনেকে গাঢাকা দেয়।

জানতে চাইলে ডিএনসির পরিচালক (অপারেশনস) কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সেখানে এত দিন তেমন নজরদারি ছিল না। এখন আবার নজরদারি বাড়ানো হবে। অন্যান্য সচেতনতা কার্যক্রমও চলছে।’

ডিএনসির উপপরিচালক (নিরোধ শিক্ষা) রবিউল ইসলাম জানান, মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরি করতে সারা দেশের ৩১ হাজার ১৭৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতার কার্যক্রম চালিয়ে ৩১ হাজার ৮০টি প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা হয়েছে। বেশির ভাগই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও কমিটি করা হয়েছে। করোনার কারণে কার্যক্রমটি বন্ধ ছিল।

এদিকে ডিএনসির সমীক্ষায় দেখা গেছে, পেশার শ্রেণিতে বেকারদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিক্ষার্থী ও গাড়িচালকদের মাদকাসক্ত হওয়ার হার বাড়ছে। গত বছরের রোগীর ৫.৮ শতাংশ ছিল গাড়িচালক। ২০১৯ সালে ছিল ৩.৭৫ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৪.২ শতাংশ।  বেকারদের মধ্যে মাদকাসক্তির সংখ্যা সব সময়ই বেশি। গত বছর ছিল ৫৭.৮৭ শতাংশ। তবে গত দুই বছর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকদের মাদকাসক্তের হার কমেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, গণপরিবহন চালকদের ৮০ শতাংশই মাদকাসক্ত। আরেকটি বেসরকারি সংস্থা দাবি করছে এই হার আরো বেশি।

ডিএনসির পরিচালক (নিরোধ শিক্ষা এবং চিকিৎসা ও পনর্বাসন) মুু. নূরুজ্জামান শরীফ বলেন, ‘ডোপ টেস্ট সবখানে কার্যকর হওয়ার পথে। এর ফলে চালকদের পরীক্ষা করা যাবে। শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময় ডোপ টেস্ট চালু হবে। আমাদের (ডিএনসি) নিয়োগেও শতভাগ ডোপ টেস্টা চালু করা হয়েছে। এর ফলে সবাই নজরদারির মধ্যে চলে আসবে।’

please click here to view dainikshiksha website