মিজানের কথা বলছি - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

মিজানের কথা বলছি

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

মিজানুর রহমান খান আমাকে ফোন করত কাজে। খাজুরে আলাপ বা অনর্থক সময় নষ্ট করার মানুষ ছিল না সে। তার পেশা, বিনোদন, অবকাশ, আগ্রহ—সব ছিল সাংবাদিকতা আর গবেষণা নিয়ে। বাংলাদেশে সংবিধান ও আইন-আদালত বিষয়ক সাংবাদিকতার বাতিঘর ও দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে আজ বুধবার (১৩ জানুয়ারি) প্রথম আলো পত্রিকায় একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধটি লিখেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল।

শ্রদ্ধাঞ্জলিতে আরও বলা হয়, করোনার প্রথম দিকে সে আমাকে ফোন করে মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে কোনো বড় মাপের গবেষণা আছে কি না সেই খোঁজে। একপর্যায়ে আমি তাকে জানালাম ড. জহিরের বহু পুরোনো একটা গবেষণা আছে এ বিষয়ে। তাই নাকি! বলে উত্তেজনায় ফেটে পড়ে মিজান। কোথায় তা পাবে, জানার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। এমনকি ঘোর করোনাকালে আমার বাসায় এসে তা ফটোকপি করে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবও দেয়। কাল সেটা তার কাছে পাঠাব এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনোমতে থামাই তাকে। কিছুক্ষণ পর সে জানায়, বিলিয়া (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স) থেকে এখনই এটি সংগ্রহ করার উপায় বের করে ফেলেছে সে।

শেষ যেদিন কথা হলো, অক্টোবরে সম্ভবত, মিজান জানতে চাইল সাংবিধানিক আইনের ওপর কোনো কমেন্টারিজ আছে কি না বাংলাদেশে? বললাম নেই, কেউ লিখছে কি না, এটাও জানি না। মিজান হতাশ হলো, মন খারাপও করল। সে সাংবিধানিক আইনের ওপর বহু লেখা লিখেছে। কিছু লেখা নিয়ে তার সঙ্গে আমার মতভিন্নতা হতো। যেমন সংবিধান সংশোধনী নিয়ে তার লেখা প্রধানত সামরিক সরকারগুলো কর্তৃক সংবিধান কাটাছেঁড়া করা নিয়ে, ১৯৭৫–এর আগের কাটাছেঁড়া নিয়ে তেমন কোনো বক্তব্য নেই তার।

এসব নিয়ে তাকে কথা শোনালেও আইন বিষয়ে তার প্রাজ্ঞতা নিয়ে আমিও বিমুগ্ধ ছিলাম। কাজেই তাকে বললাম, আপনিই লিখে ফেলেন কমেন্টারিজ একটা। এই প্রস্তাব মিজানের খুব পছন্দ হলো। সে আকাশ–বাতাস ফাটিয়ে হাসল। বলল, আমার তো ল ডিগ্রি নাই। মানুষ তো বলবে এই মিয়া...

তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, এ জন্যই লিখবেন। আমাদের একটা শিক্ষা হওয়া দরকার। মিজান এটা শুনে আবারও আমোদিত হলো। হা হা করে হাসল।

মিজান কি লেখাটা শুরু করেছিল? আমি জানি না। শুধু এটা জানি যে সে এখন নেই আর এই পৃথিবীতে। তার চলে যাওয়ার সংবাদে আহাজারি করতে দেখেছি কুড়িগ্রামের এক বিচারক থেকে শুরু করে কক্সবাজারে থাকা আমার এক ছাত্রকে। তার বেদনায় আওয়ামী লীগ মুহ্যমান হয়েছে, বিএনপি বিদীর্ণ হয়েছে, বাম-ডান সবাই শোকাহত হয়েছে। ফেসবুক বিলীন হয়েছে তার ছবিতে, তার গল্পে। করোনাকালে কত মানুষকে হারিয়েছি, কারও মৃত্যুতে এমন শোকের ঐকতান দেখিনি আমি কোনো দিন!

আমাদের এই বেদনার খবর পাবে কি মিজান অন্য ভুবনে? মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কোনো কৌশল, কোনো চালাকি, কোনো চেষ্টা করেনি সে। কঠিন কঠিন বিষয়ে কঠিনভাবে লিখে গেছে সারা জীবন। আড্ডা, গল্পগুজব, দলবাজি থেকে দূরে থেকেছে। মতিউর রহমানের ভাষায় ‘আউলা-ঝাউলা’‘ আনিসুল হকের ভাষায় ‘অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসরের‘ জীবন ছিল তার।

প্রথম আলো অফিসে গিয়ে তাকে আমার মনে হতো, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বা আপন জগতে নিমজ্জিত একজন মানুষ। টেবিল উপচানো কাগজপত্রের স্তূপ, হাই পাওয়ার চশমা আর নীরস কম্পিউটার স্ক্রিনে সমর্পিত একজন মানুষ। এমন একটা জীবন যাপন করে কীভাবে সে এত মানুষের মন জয় করল!

২.
মিজান ছিল আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক। বিদেশে সাংবাদিকেরা একটা বিষয় কাভার করতে করতে তার ওপর বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। মিজানও তাই হয়েছিলেন সংবিধান, আইনব্যবস্থা ও মানবাধিকার বিষয়ে। তার জ্ঞানের তৃষ্ণা ছিল অস্বাভাবিক পর্যায়ের, পরিশ্রম করার ক্ষমতা ছিল অমানুষিক আর নিষ্ঠা ছিল অপরিমেয়। ঝালকাঠির এক তরুণ, মফস্বল কলেজে হিসাববিজ্ঞান পড়া একজন মানুষ হয়েও সে হয়ে উঠেছিল দেশের একজন উঁচু মানের আইনবিশেষজ্ঞ। আইনের ওপর তার ডিগ্রি ছিল না কোনো, তারপরও সে বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছে, আইন ও সংবিধানবিষয়ক আলোচনায় দেশের সেরা আইনবিদদের সঙ্গে সমানতালে আলোচনায় অংশ নিয়েছে, কঠিন, জটিল ও অতি দীর্ঘ রায়ের ক্রিটিক লিখেছে। প্রধান বিচারপতিদের বিভিন্ন রায় ও সিদ্ধান্ত, আইন মন্ত্রণালয়ের খসড়া ও আইনবিশারদ মাহমুদুল হকের সাংবিধানিক আইন বইয়ের ত্রুটিবিচ্যুতি ধরিয়ে দেওয়ার মতো আত্মবিশ্বাস ও গভীরতা ছিল তার। আমি নিজে ড. কামাল হোসেনকে একটি মামলার প্রস্তুতির বিষয়ে মিজানকে ফোন করে পরামর্শ নিতে শুনেছি। বাংলাদেশের কোনো সাংবাদিক তার বিষয়ে এমন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি। এমনকি বাংলাদেশের বহু আইনের শিক্ষক বা বড় অনেক আইনজীবীরাও নন!

মিজান একজন অসাধারণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদকও ছিল। কোনো বিষয়ে সংবাদমূল্য বোঝার, তথ্য ও সোর্সের খোঁজ করার, ক্রমাগত ও ক্লান্তিহীন অনুসন্ধানের সহজাত ক্ষমতা ছিল তার। প্রথম আলোতে সে যোগ দেওয়ার পর প্রথম দিকে মাসে প্রায় প্রতিদিন বাই লাইনে তার প্রতিবেদন পড়ার স্মৃতি আছে আমার। জাত সাংবাদিককে মাধ্যম আটকাতে পারে না। আমাদের প্রজন্মের মানুষ হয়েও প্রযুক্তিনির্ভর ভিডিও সাংবাদিকতায়ও তার ছিল সহজাত ও শক্তিশালী পদচারণ।

মিজানের আরেকটা বড় সম্পদ ছিল তার মানবিকতা, তার মানবিক মূল্যবোধ। আমাদের শিল্প-সাহিত্যজগতের, সাংবাদিকতার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পরচর্চা থাকে প্রধান একটি বিষয়। মিজানকে আমি কখনো তা করতে দেখিনি। সে লেখার, রায়ের, গবেষণার সমালোচনা করেছে, লেখকের, সাংবাদিকের বা আইনবিদের নয়। সে যখন পারে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। যতভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়, দাঁড়িয়েছে।

মিজানের সব গুণ ছিল, ছিল না শুধু নিজের প্রতি খেয়াল। থাকলে সে ঘোর করোনাকালে শ্বাসকষ্ট আর শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মাঠে–ময়দানে কাজ করে বেড়াত না। থাকলে সে নিজের চিকিৎসা নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিত না। থাকলে সে স্ত্রী-সন্তান, আর অগণিত ভালোবাসার মানুষকে রেখে এভাবে চলে যেত না এমন অকালবয়সে!

৩.
প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে তার নিথর দেহের কফিন। ফুল দেওয়া হয়েছে, দোয়া হয়েছে, হয়েছে অশ্রুপাত। একটু পর হয়তো দেখানো হবে তার মুখ। সেই মুখ হা হা করে হেসে উঠবে না, উচ্চ কণ্ঠে শোরগোল করবে না, জীবনের আলো ঝিক করে উঠবে না তার গভীর চোখে।

এই মিজানকে দেখব না আমি। দেখতে চাই না। তার চেয়ে ভালো জীবনের আয়োজনে মিশে যাওয়া। আবার আমি বিষাদ ভুলব, ট্রাম্পের কাণ্ড দেখব, সাকিবদের জয়ে শিহরিত হব, ফেসবুকে লিখব কতবার মুদ্রণ হলো আমার বই।

তবে তার ফাঁকে ফাঁকে, হঠাৎ কখনো মনে পড়বে মিজানের কথা। তার সরল মুখ, উদাত্ত কণ্ঠ, ঘর কাঁপানো হাসি। মনে পড়বে তার শাণিত বিশ্লেষণ। তুলাধোনা করা সাক্ষাৎকার। গোপন দলিল উদ্‌ঘাটন।

মনে পড়বে তার ফোনের কথা। সেখানে লেখা আছে, মিজান পিএ মানে মিজান, প্রথম আলো।

এই নম্বরটা কোনো দিন মুছব না। আমাদের আড্ডায়, লেখায়, প্রত্যাশায় বরং রাখব সঙ্গে তাকে। নতুন প্রজন্মকে বলব নিবিড়, প্রখর আর বিশুদ্ধ একজন মানুষের কথা।

আমরা এটা বলব, মিজান।

অনুদানের টাকা পেতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনলাইন আবেদন শুরু ১ ফেব্রুয়ারি - dainik shiksha অনুদানের টাকা পেতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনলাইন আবেদন শুরু ১ ফেব্রুয়ারি উপবৃ্ত্তি পেতে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক - dainik shiksha উপবৃ্ত্তি পেতে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক পিকে হালদার কাণ্ডে এন আই খানের নাম ভুলভাবে যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদন - dainik shiksha পিকে হালদার কাণ্ডে এন আই খানের নাম ভুলভাবে যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম ফি নেয়ার সিদ্ধান্ত - dainik shiksha বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম ফি নেয়ার সিদ্ধান্ত সংসদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার দাবি - dainik shiksha সংসদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার দাবি সব সহকারী শিক্ষককে ১৩তম গ্রেডে বেতন দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি - dainik shiksha সব সহকারী শিক্ষককে ১৩তম গ্রেডে বেতন দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি প্রাথমিকে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা জানতে চেয়ে চিঠি - dainik shiksha প্রাথমিকে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা জানতে চেয়ে চিঠি please click here to view dainikshiksha website