মোস্তান ভাইয়ের ‘ঋণ পরিশোধের সূত্র’ - সম্পাদকের কলাম - দৈনিকশিক্ষা

মোস্তান ভাইয়ের ‘ঋণ পরিশোধের সূত্র’

সিদ্দিকুর রহমান খান |

আমার স্ত্রী অনেকবার আমাকে বলছে, বাসায় যেন একটা বাংলা লেখা কী বোর্ড নিয়ে আসি। সেটা বাসার ল্যাপটপে যুক্ত করে দেখে দেখে বাংলা টাইপ করা শিখবে। কিন্তু আমি সেই কীবোর্ড আনিনি। কখনো ইচ্ছায়, কখনো ইচ্চাকৃত ভুলে। যখন ভুলে যাই তখন তাকে বলি ভুলে গেছি। আর যখন মনে পড়ে তখন ইচ্ছা করে আনিনা। কিন্তু শেষোক্ত কথাটা তাকে বলিনা।

সব সময় ইংরেজি কাগজের রিপোর্টার হওয়া সত্ত্বেও পিসি ও ল্যাপটপে আমার বাংলা টাইপিং স্পিড কিভাবে এত বেশি হলো? কিভাবে কীবোর্ডের দিকে না তাকিয়ে সমানে টাইপ করে যেতে পারি বাংলা ও ইংরেজি দুটোই? আমি সব সময় শুধু ইংরেজি কীবোর্ডই ব্যবহার করি কেন? অভ্রতে কেন লিখি না। এসব নিয়ে আমার সহকর্মীদের মধ্যে আলোচনা নিরন্তর। অভ্রতে লিখলে বাংলাভাষার কি ক্ষতি তা অন্য লেখায় আলোচনা করবো।

২৫/৩০ বছর আগের কথা। বাসায় বসে ইংরেজি টাইপ রাইটারে লিখে অবজারভার, নিউ নেশন, ডেইলি স্টার ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার ম্যাগাজিনে আমার পাঠানো বেশ কয়েকটা ফিচার টাইপের লেখা ছাপা হয়েছে। এতে বন্ধুমহলে ব্যাপক ভাবও হয়েছে আমার। 
কিন্তু ‘অ্যাপেল ম্যাকেনটোশ’? যা প্রথম ব্যবহার করি রাজধানীর শুক্রাবাদের সাপ্তাহিক রাষ্ট্র পত্রিকা অফিসে। অফিসটা একজন সাংবাদিকের ঘরের একটা কক্ষে। আবার সেই পত্রিকার সব কর্মীই ওই বাসায়ই দুপুরের খাওয়া-দাওয়া করেন। ঘরের মধ্যে অফিস, সেই পত্রিকাটিই বা কেমন? সেই পত্রিকার উদ্যোক্তাই বা কেমন? জন্ম অথবা মৃত্যুবার্ষিকীতে দু’চারপাতা লিখে তা শেষ করার মতো না। কমপক্ষে দু’চারটা বই হতে হবে। সেই বই লিখতে হলে মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে সৎ হতে হবে। অনুসন্ধিৎসু হতে হবে। সাংবাদিক কিংবা গবেষক কিংবা জাত লেখক হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের উদ্যোগে মোস্তান ভাইয়ের ওপর বিস্তর গবেষণা হতে হবে। আর আজ যারা কম্পিউটার ব্যবসা করেন তাদেরকে “বাংলাদেশে কম্পিউটারকে জনপ্রিয় করে তোলায় সাংবাদিক নাজিম উদ্দীন মোস্তানের অবদান” শীর্ষক বাধ্যতামূলক বার্ষিক অনুষ্ঠান করতে হবে। শিরোনাম এমনও হতে পারে, “বাংলাদেশে কম্পিউটার জনপ্রিয়করণ : নাজিম উদ্দীন মোস্তানের ঋণ”।  

পাঠক, এবার একটু মোস্তানের পরম বন্ধু আহমদ ছফার “পূষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ” উপন্যাসের কথা বলি। এই উপন্যাসটিতে আশির দশকে রাজধানীর বস্তিবাসী শিশুদের জন্য ছফা ও মোস্তানের উদ্যোগে তৈরি করা পাঠশালায় মোস্তান ও তাঁর স্ত্রীর অবদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। আমার জানামতে তিনটি ভাষায় উপন্যাসটি অনূদিত হয়েছে। এটা উৎসর্গ  করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক ড. আহমেদ কামাল ও সাংবাদিক নাজিম উদ্দীন মোস্তানকে। 

ছফা তাঁর অমর সৃষ্টি বিহঙ্গ পুরাণে লেখেন, “এই সময়ে মোস্তানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ...কী করে পরিচয় হল, উপলক্ষটার কথা বলি। পাকিস্তানি পদার্থ বিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর আবিষ্কৃত তত্ত্বের ওপর একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই বক্তৃতা শোনার ভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু ইত্তেফাক পত্রিকার রিপোর্ট পড়ে আমার মনে হলো, প্রফেসর সালামের তত্ত্বটি বুঝতে আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। এটাতো বড়ই আশ্চর্যের কথা। এমন সাংবাদিক আমাদের দেশে আছেন, সালাম সাহেবের দুরূহ তত্ত্বকে অ তে অজগর এরকম সহজ করে বোঝাতে পারেন। ঠিক করলাম সেদিনই সন্ধ্যে বেলায় ইত্তেফাক অফিসে যেয়ে খোঁজ করব। এরকম একজন কামেল মানুষ আমাদের দেশে আছেন। সশরীরে গিয়ে যদি সালাম না করি নিজেকেই অসম্মান করব। গেলাম ইত্তেফাকে। ...টেবিলে ঝুঁকে পড়ে রিপোর্ট লিখছেন। শুধু মাথাটাই দেখা যাচ্ছে। এই একটুখানি মানুষ'।”

বস্তিবাসী শিশুদের স্কুলে পড়ানো প্রসঙ্গে বিহঙ্গ পুরাণে ছফা আরো  লেখেন, “মোস্তান এত অনুরাগ নিয়ে বাচ্চাদের শেখাচ্ছিলেন দেখে মনে মনে আমার খুব ঈর্ষা হত। অফিসের সময়টুকু ছাড়া সমস্ত অবসর তিনি বাচ্চাদের পেছনে দিতেন। নিজের মেয়ে দুটোকেও তিনি বাচ্চাদের সঙ্গে বসিয়ে দিতেন। আমি বলতাম একটু কি বাড়াবাড়ি হচ্ছে না মোস্তান? মোস্তানের ওই এক জবাব, বস্তির ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে বসতে না শিখলে কোনো বাচ্চা সঠিক মানুষ হতে পারবে না”।

পাঠক, ঋণ পরিশোধের সূত্র বিষয়ে কয়েকটা প্যারা লিখেই আজকের পর্বটি শেষ করবো। 

ঋণ লিখতে কীবোর্ডের জি ও এ চাপতে হয়। যখনই ঋণ লিখতে যাই তখনই মোস্তান ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। খুব সম্ভবত ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের কথা। তখনও মোস্তান ভাই বাম হাত দিয়ে শিফট চেপে ধরে শুধু তর্জনি দিয়ে ঠক ঠক করে পুরো কীবোর্ড চাপতেন। এভাবেই লিখতেন তিনি। কিন্তু তাঁর নতুন শিষ্য-সহকর্মীদের জন্য দশ আঙ্গুলের ব্যবহার বাধ্যতামূলক! নইলে স্পিড আসবে না। এমন উপদেশ তাঁর। শুধু তর্জনি দিয়ে পুরো কীবোর্ড চাপলে মস্তিকে চাপ পড়ে এটাও প্রথম শুনি মোস্তান ভাইয়ের কাছে।   

একদিন রাষ্ট্র অফিসে আপেল ম্যাকেনটোশে ইংরেজি ম্যাগাজিন থেকে কি যেন একটা অনুবাদ করছি। ঋণ শব্দটা লেখার দরকার হলেও পারছি না। কাউকে বলছিও না। সময় নষ্ট হচ্ছে।  পেছনে দাঁড়ানো মোস্তান ভাই হঠাৎ বলে উঠলেন, জি ও এ চাপুন।

“ঋণ পরিশোধের সূত্র হলো ঋণ কখনো পরিশোধ করা যায় না”। এই সূত্র মোস্তান ভাইয়ের মুখেই প্রথম শুনি। টিনএজ আমি প্রথমে মোস্তানের এই সূত্র মানতে চাইনি। তখন জগন্নাথ কলেজের অর্থনীতির ছাত্র আমি। অনেক যুক্তি দেখিয়েছি। 
এক বিকেলে রাষ্ট্র অফিসে জেঁকে ধরলেন মোস্তান ভাই। আমাকে বললেন, ‘ধরুন আপনার কাছে এক টাকাও নেই। আপনার এক বন্ধুর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা ধার নিয়ে শেষদিনে কলেজে ভর্তির ফরম পূরণ করলেন। পরে নির্ধারিত সময়েই বন্ধুকে টাকাটা ফেরত দিলেন। এতে কি সেই বন্ধুর দুই হাজার টাকার ঋণ শোধ হবে?  সেটা কি শুধুই দুই হাজার টাকা? ওই টাকাটা না হলে তো আপনার ফরম পূরণই হতো না। আমি বললাম, অবশ্যই হবে। তিনি বললেন, না। আমি বললাম, সুদসহ দিতে হবে? মোস্তান ভাই হেসে বললেন, “না তাতেও হবে না”। কেন হবে না তার ব্যাখ্যা দিলেন মোস্তান ভাই। সেই ব্যাখ্যা শুনে কি যে অবস্থা হয়েছিলো তা অল্প কথায় লিখে বোঝাতে পারবো না। মোস্তান ভাইয়ের ব্যাখ্যা শুনে ১৮/১৯ বছর বয়সী নিজেকে  তখন মনে হয়েছে, “রিপোর্টার হলেও ছোট রয়ে গেছি।” দেশের এক নম্বর পত্রিকা ইত্তেফাকের ১ নম্বর রিপোর্টার নাজিম উদ্দীন মোস্তানের সঙ্গে রিপোর্টার হওয়ার আশায় বরিশাল থেকে ঢাকায় আসা এই পুঁচকে সিদ্দিক কোনোদিন আর কোনো যু্ক্তি দেখাবে না। আজ থেকে “গুরুবাক্য শিরোধার্য”।   

পাঠক,  শুরুতে বলেছিলাম আমার কলেজ শিক্ষক স্ত্রীকে বাংলা লেখা কীবোর্ড না কিনে দেয়ার কথা। আসলে বাধ্য হয়েই সে ইংরেজি কীবোর্ডেই বাংলা লেখা শিখে ফেলেছে। মাঝে মাঝে ঋণ বা এমন কম ব্যবহার হওয়া শব্দ লিখতে আমার স্মরণাপন্ন হয়। 

আমি আজও যখন যে অবস্থায়ই ঋণ বানান লিখতে যাই তখন মোস্তান ভাইয়ের কথা মনে পড়ে, ‘জি ও এ চাপুন’। শুধু ঋণ বানান না, ধারাবাহিকভাবে লিখবো বাংলাদেশে কম্পিউটার জনপ্রিয়করণ, অর্থনীতি, কৃষিখাত, ধোলাইখালের দেশী শিল্প ও সাংবাদিকতার বিভিন্ন বিটের প্রবর্তক মোস্তান ভাইকে নিয়ে। 

আজ তাঁর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। স্যালুট।

সিদ্দিকুর রহমান খান: সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক শিক্ষাডটকম। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: এডুকেশন রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ইরাব)।   

উচ্চতর গ্রেড পাচ্ছেন ১ হাজার ৮৮ শিক্ষক - dainik shiksha উচ্চতর গ্রেড পাচ্ছেন ১ হাজার ৮৮ শিক্ষক প্রাথমিকে শিক্ষকসহ অন্যান্য পদ ‘বাড়ছে’ - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষকসহ অন্যান্য পদ ‘বাড়ছে’ ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষাবিমা’ চার্জমুক্ত রাখার নির্দেশ - dainik shiksha ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষাবিমা’ চার্জমুক্ত রাখার নির্দেশ এমপিওভুক্ত হলেন দেড় হাজার শিক্ষক-কর্মচারী - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হলেন দেড় হাজার শিক্ষক-কর্মচারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এখনো সংক্রমণের খবর আসেনি : শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এখনো সংক্রমণের খবর আসেনি : শিক্ষামন্ত্রী স্বরাষ্টমন্ত্রীর সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান নেতাদের মত বিনিময় - dainik shiksha স্বরাষ্টমন্ত্রীর সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান নেতাদের মত বিনিময় শিক্ষকদের একটা বড় অংশ ঘটনাচক্রে শিক্ষক : শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষকদের একটা বড় অংশ ঘটনাচক্রে শিক্ষক : শিক্ষামন্ত্রী ডিসেম্বর পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ডিসেম্বর পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকা বিএড স্কেল পেলেন ৫৮ শিক্ষক - dainik shiksha বিএড স্কেল পেলেন ৫৮ শিক্ষক please click here to view dainikshiksha website