শিক্ষক সংকটে বিবর্ণ পাঠদান - দৈনিকশিক্ষা

শিক্ষক সংকটে বিবর্ণ পাঠদান

রুম্মান তূর্য |

শিক্ষার্থী চার শতাধিক। শিক্ষক মোটে ৯ জন। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে বাংলা, ইংরেজি ও কৃষি শিক্ষা বিষয়ের কোনো শিক্ষক নেই। কখনো হিসাববিজ্ঞান, কখনো সমাজের শিক্ষক নিচ্ছেন ইংরেজির ক্লাস। এ পরিসংখ্যান টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে কুড়িপাড়া গণ উচ্চ বিদ্যালয়ের। ক্লাস চালাতে হিমশিম খাওয়ার নেপথ্যে আছে এ প্রতিষ্ঠানের মোট ১৪ টির মধ্যে তিনটি পদের শূন্যতা। 

জানতে চাইলে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন দৈনিক আমাদের বার্তাকে বলেন, ‘বাংলা, ইংরেজি ও কৃষি বিষয়ের ক্লাস চালাতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আমি ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ সব শিক্ষকদের প্রতিদিন কমপক্ষে ৫টি ক্লাস নিতে হচ্ছে। দুইজন শিক্ষক আছেন যাদের প্রতিদিন সাত পিরিয়ড ক্লাস নিতে হয়। ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে সমাজবিজ্ঞান ও হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষককে। সহকারী প্রধান শিক্ষক স্যারও ইংরেজির ক্লাস নিচ্ছেন।’

সংকটের এ পরিস্থিতির আরেক উৎকৃষ্ট উদাহরণ পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার এফ করিম আলিম মাদরাসা। এ প্রতিষ্ঠানটির মোট ২৩টি শিক্ষক পদের মধ্যে ১১টিই শূন্য। বিষয়টি নিশ্চিত করে অধ্যক্ষ মো. শাহ আলম দৈনিক আমাদের বার্তাকে জানান, ‘১১টি শিক্ষক পদ শূন্য থাকলেও চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র দুইজন। ফলে নতুন শিক্ষকরা যোগদান করলেও আমার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক সংকট কাটবে না।’
অধ্যক্ষ আরো জানান, প্রতিষ্ঠানের দখিল শাখায় সহকারী মৌলভী, জুনিয়র মৌলভী, গণিত, ক্বারী, শারীরিক শিক্ষাসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ের শিক্ষক পদ শূন্য। আবার আলিম শাখায় আরবি প্রভাষক, আইসিটি প্রভাষকসহ মোট তিনটি শিক্ষক পদ শূন্য আছে। ফলে ক্লাস চালাতে হিমশিম খাচ্ছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। ১১ জন শিক্ষককে নিতে হচ্ছে ২৩ জনের ক্লাস। এ দুরবস্থা কবে কাটবে তাও বলতে পারছেন না তিনি। 

তবে এ শূন্যতা কাটানোর চেষ্টা চলছে ভিন্নভাবে। যেমন ঘাটাইলে কুড়িপাড়া গণ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলছিলেন, প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পদে থেকেও নিতে হচ্ছে সমাজবিজ্ঞান শিক্ষকের বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ের ক্লাস। সঙ্গে নিতে হচ্ছে প্রক্সি ক্লাসগুলোও। প্রধান শিক্ষক জানান, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধানকে ক্লাসে ব্যস্ত হতে হওয়ায় স্কুলের প্রশাসনিক কাজ ঠিকভাবে চালাতে পারছেন না। কয়েকজন শিক্ষককে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হচ্ছে। সবচেয়ে অসুবিধা হচ্ছে নবম ও দশম শ্রেণির ক্ষেত্রে। বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগের তিনটি আলাদা শ্রেণিতে তিনজন শিক্ষক প্রয়োজন। অপর দিকে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম বাস্তাবায়িত হলেও শিক্ষার্থীদের দিকে ঠিকভাবে নজর দেয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, তিনটি পদ শূন্য হলেও চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে তিনজন প্রার্থী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ না করায় তারা যোগদান করতে পারেননি। তারা যোগদান করলে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। অবিলম্বে এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ প্রয়োজন। নির্বাচিত শিক্ষকদের দ্রুত যোগদানের ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে অনুরোধ জানান তিনি। 

শুধু্ এ দুটি প্রতিষ্ঠানটিই নয়, সারাদেশের এমপিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক সংকট এখন চরমে। সারাদেশের ৩০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোট সাড়ে পাঁচ লাখের মতো শিক্ষক-কর্মচারী পদ আছে। এগুলোর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পদ শিক্ষকের। যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ শিক্ষক পদ এ মুহূর্তে শূন্য আছে বলে ধারণা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের। এরমধ্যে ৬৮ হাজার পদ শূন্য আছে প্রায় ১ বছরের বেশি সময় ধরে। 

সর্বশেষ ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের জুন থেকে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শূন্যপদের তথ্য সংগ্রহ করেছিলো শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। পরে সে বছরের আগস্ট মাসের শেষ দিকে ও সেপ্টেম্বরে যাচাই-বাছাইয়ের পর দেখা যায় তখনই দেশে ৬৮ হাজারের বেশি শিক্ষক পদ শূন্য ছিলো। সে হিসেবে চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছিলো এনটিআরসিএ। এই ধাপে মাত্র ৩২ হাজারের কিছু বেশি শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে, তাদের মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষক যোগদান করতে চাচ্ছেন। এ চক্রে নির্বাচিত নিবন্ধিত শিক্ষক প্রার্থীরা যোগদান করলেও চলতি সংকট কাটবে বলে মনে করেন না বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রধানেরা। বরং তারা বলছেন, একদিকে বুঝে উঠতে না পারা নতুন পাঠ্যক্রম অন্যদিকে তীব্র শিক্ষক-এই দুইয়ের মাঝখানে এক অসহনীয় যাতাকলে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।

এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের সংগঠন বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও রাজধানীর বিটিসিএল আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান বাবুল দৈনিক আমাদের বার্তাকে বলেন, এ মুহূর্তে সারাদেশে বহু শিক্ষক পদ শূন্য আছে। ফলে ক্লাস চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের। এক তৃতীয়াংশ শিক্ষক পদ খালি আছে বলে ধারণা কারো কারো। যা নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য অন্তরায়। এ পরিস্থিতিতে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদের দ্রুত যোগদানের ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। আর অতিদ্রুত শূন্যপদের তথ্য সংগ্রহ করে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। 

এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক সংকট কবে নাগাদ কাটবে সে বিষয়ে কিছু বলতে পারছে না শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনটিআরসিএর সংশ্লিষ্ট শাখার একজন কর্মকর্তা গতকাল রোববার বিকেলে দৈনিক আমাদের বার্তাকে বলেন, কিছু কিছু বিষয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক নিবন্ধিত প্রার্থী না থাকায় চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে সব পদ পূরণ করা যায়নি। এদিকে ১৭তম শিক্ষক নিবন্ধনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে নতুন শিক্ষক নিয়োগে গণবিজ্ঞপ্তি দিলেও প্রার্থী পাওয়া যাবে না। আবার চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তির কার্যক্রম শেষ না করেও পঞ্চম গণবিজ্ঞপ্তির কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে কবে নাগাদ শিক্ষক সংকট কাটবে সে বিষয় মন্তব্য করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, এখন যদি পঞ্চম চক্রে শিক্ষক নিয়োগের জন্য শূন্যপদের তথ্য সংগ্রহ করা হয় তবে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচিত প্রার্থীদের পদগুলো শূন্য বলে তথ্য দিতে পারেন। তাই নির্বাচিত প্রার্থীদের চূড়ান্ত সুপারিশ করে শূন্যপদের তথ্য সংগ্রহে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ই-রেজিস্ট্রেশনের কাজ শুরু করা হবে। ই-রেজিস্ট্রেশনের জন্য এক মাসের মতো সময় প্রয়োজন। ই-রেজিস্ট্রেশনের পর শূন্যপদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই বাছাইয়ে আরো দুই মাসের মতো সময় লাগতে পারে। ততোদিনে নতুন প্রার্থীরা চূড়ান্তভাবে নিবন্ধিত হতে পারবেন।  এনটিআরসিএ চাচ্ছে ডিসেম্বরেই ১৭তম শিক্ষক নিবন্ধনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করতে। 

এনটিআরসিএর ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, আসলে নিবন্ধন পরীক্ষা নিয়ে যে প্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের সুপারিশ করা হয় তাতে আগের শূন্যপদের ‘ব্যাকলগ’ থেকে যায়। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কম বেশি শূন্যপদ শূন্যই থেকে যায়। এ পরিস্থিতিতে আসলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের কমিশন গঠনের কার্যক্রমকে বেগবান করা। তা না হলে শিক্ষক সংকট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিত্যসঙ্গী থেকেই যাবে। কমিশনের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ হলে শূন্যপদের বিপরীতে প্রার্থী নির্বাচিত হবেন। ফলে ‘ব্যাকলগ’ থাকবে না। 

নতুন শিক্ষকদের যোগদানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, যে আইনি জটিলতা নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সলিসিটর উইংয়ের মতামত এখনো পাওয়া যায়নি। এনটিআরসিএ চাচ্ছে দ্রুত নির্বাচিত প্রার্থীদের চূড়ান্ত সুপারিশ করতে। 

সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানতে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান এনামুল কাদির খানের সঙ্গে দৈনিক আমাদের বার্তার পক্ষ থেকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।

 

শিক্ষার সব খবর সবার আগে জানতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেলের সাথেই থাকুন। ভিডিওগুলো মিস করতে না চাইলে এখনই দৈনিক শিক্ষাডটকমের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন এবং বেল বাটন ক্লিক করুন। বেল বাটন ক্লিক করার ফলে আপনার স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটারে সয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিওগুলোর নোটিফিকেশন পৌঁছে যাবে।

দৈনিক শিক্ষা ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

দৈনিক শিক্ষার নামে একাধিক ভুয়া পেজ-গ্রুপ ফেসবুকে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষার নামে একাধিক ভুয়া পেজ-গ্রুপ ফেসবুকে কওমি মাদরাসা: একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা গ্রন্থটি এখন বাজারে - dainik shiksha কওমি মাদরাসা: একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা গ্রন্থটি এখন বাজারে র‌্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা কলেজগুলোর নাম এক নজরে - dainik shiksha র‌্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা কলেজগুলোর নাম এক নজরে পরিবর্তনশীল বিশ্বের মতোই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী - dainik shiksha পরিবর্তনশীল বিশ্বের মতোই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী জিপিএ-৫ পেয়েও কলেজ মনোনয়ন পায়নি সাড়ে ৮ হাজার শিক্ষার্থী - dainik shiksha জিপিএ-৫ পেয়েও কলেজ মনোনয়ন পায়নি সাড়ে ৮ হাজার শিক্ষার্থী সরকারি কলেজগুলোকে পাশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত করার পরামর্শ - dainik shiksha সরকারি কলেজগুলোকে পাশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত করার পরামর্শ গুচ্ছে দ্বিতীয় পর্যায়ে ভর্তি শুরু ২৬ জুন - dainik shiksha গুচ্ছে দ্বিতীয় পর্যায়ে ভর্তি শুরু ২৬ জুন সভাপতি-প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ - dainik shiksha সভাপতি-প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ please click here to view dainikshiksha website Execution time: 0.0061769485473633