সাহিত্যে নোবেল পেলেন উপনিবেশবাদের দুষ্টক্ষতের লেখক - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

সাহিত্যে নোবেল পেলেন উপনিবেশবাদের দুষ্টক্ষতের লেখক

মাছুম বিল্লাহ |

তানজানিয়ায় জন্ম নেওয়া ৭২ বছর বয়সী আবদুলরাজাক গুরনাহ্ পঞ্চম আফ্রিকান হিসেবে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। আমরা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরনাহ্কে উষ্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছি। উপনিবেশবাদের কারণে মানুষের দুর্দশা ও শরণার্থী জীবনের ঘটনা আপসহীন ও সকরুণভাবে চিত্রিত করার জন্য আবদুলরাজাক গুরনাহ্কে সম্মানিত করা হয়েছে। আর নোবেল কমিটি এক বিবৃতিতে বলেছে,  ‘আবদুলরাজাক গুরনাহ্র উপন্যাস গৎবাঁধা বর্ণনার বাইরে। উপন্যাসে তিনি পূর্ব আফ্রিকার সাংস্কৃতিক  বৈচিত্র্য বিশ্বের অন্যান্য  অংশের মানুষের কাছে সুনিপুণভাবে  তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।’১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব আফ্রিকারে দেশ তানজানিয়ার ভারত মহাসাগর ঘেঁষা দ্বীপ জানজিবারের এক সাধারণ পরিবারে  গুরনাহর জন্ম। সেখানেই বেড়ে ওঠা। তৎকালীন উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বিপ্লবের মুখে প্রাণ বাঁচাতে ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে জানজিবার ছেড়ে শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেন তিনি। ওই বিপ্লবের কারণে আরব বংশোদ্ভুতদের ওপর নেমে আসে নির্মম দমন-পীড়ন। সেই কাহিনীই গুরনাহ্র লেখার উপজীব্য হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাজ্যে গিয়ে  গুরনাহ ২২ বছর বয়সে শুরু করেন লেখালেখি। তবে কখনোই তিনি শেকড়কে ভোলেননি। যুক্তরাজ্যে বসবাসের পরও তিনি তার নিজস্ব ভাষা ছাড়েননি। ওই ভাষা  ছিল তাঁর যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। আর সাহিত্য রচনার জন্য তিনি ইংরেজি ব্যবহার করেছেন। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয় জানজিবার। প্রেসিডেন্ট আবেইদ কারুমের শাসনে সেখানে আরব বংশোদ্ভূত নাগরিকদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। আট বছর বয়সে গুরনাহ্ দেশ ত্যাগ করেন। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের আগে তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি। শুধু বাবার মৃত্যুর পর তিনি একবার গিয়েছিলেন নিজ দেশে।

গুরনাহ সম্পর্কে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি বলেছে, সত্যের প্রতি আবদুলরাজাক গুরনাহর যে নিষ্ঠা, ঘটনার অতি সরলীকরণে তাঁর যে ঘোর আপত্তি, পাঠককে তা নাড়া দেয়। তাঁর উপন্যাস গতানুগতিক ধারা বর্ণনার রীতি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের দৃষ্টির সামনে মেলে ধরে সংস্কৃতি বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এক পূর্ব আফ্রিকাকে, যার সঙ্গে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলের  মিল নেই। তার চরিত্ররা নিজেদের আবিষ্কার করে সংস্কৃতি থেকে সংস্কৃতি, মহাদেশ থেকে মহাদেশের মাঝে কোনো এক শূন্য রেখায়, যে জীবন তাদের ছিল আর যে জীবন তাদের সামনে ভাঁজ খুলতে শুরু করেছে, তার মাঝে এক অবলম্বনহীন অস্তিত্বে তারা নিজেদের খুঁজে পায়, এই অনিশ্চয়তার কোনো নিদান হয় না। তিনি যখন ইংল্যান্ডে আসেন, আশ্রয়প্রার্থী বা এ রকম শব্দগুলোর মানে তখন আজকের মতো ছিল না। এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৬০-এর সেইসব দিনের চেয়ে আজকের পৃথিবীতে সহিংসতা অনেক বেশি। ফলে যেসব দেশে জীবন নিরাপদ বলে মনে করা হয়, তাদের ওপর চাপও বেশি। অবধারিতভাবে অনেক বেশি মানুষ এখন সেসব দেশে যাচ্ছে আশ্রয়ের আশায়।

আমরা জানি সাহিত্যে এ পর্যন্ত নোবেল পেয়েছেন ১১৮ জন, যাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৬ জন। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম আফ্রিকান (আলজেরিয়ায় জন্মগ্রহণকারী ফ্রান্সের নাগরিক) হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পান আলবের কামু। ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে নাইজেরিয়ার ওল সোয়িঙ্কা। ১৯৮৮-তে মিসরের নাগিব মাহফুজ এবং ২০০৩-এ দক্ষিণ আফ্রিকার জে এম কোয়েট্জি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল জিতেছেন ডোরিস লেসিং, তিনি ২০০৭-এ ৮৮ বছর বয়সে এই আন্তর্জাতিক পুরস্কারটি পান। সরাসরি নোবেল ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৮-তে প্রথমবারের মতো সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বাতিল করা হয়। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময়ও যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে দেওয়া হয়নি। ২০১৮-তে নোবেল কমিটির এক সদস্যের স্বামী ও জনপ্রিয় আলোকচিত্রী জ্যঁ ক্লদ আর্নোর বিরুদ্ধে যৌন কেলেংকারির অভিযোগ আনা হয়। পরে ওই ঘটনায় তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। যৌন কেলেংকারির পাশাপাশি বিজয়ীর নাম ফাঁস করার অভিযোগ আনা হয়। বিতর্কের মুখে স্থগিত করা হয় সাহিত্যে সে বছরের নোবেল প্রদান। কেলেংকারির কারণে ২০১৯ থেকে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে শুরু করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি। পাল্টে যায় নোবেল কমিটির কাঠামোও। সে বছর ২০১৯-এর বিজয়ীর পাশাপাশি ঘোষণা করা হয় ২০১৮-এর স্থগিতকৃত বিজয়ীর নামও। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল পান আমেরিকান কবি লুইস গ্লাক। সুইডিশ একাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্লাককে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তার নিরাভরণ সৌন্দর্যের ভ্রান্তিহীন কাব্যকণ্ঠের কারণে যা ব্যক্তিসত্তাকে সার্বজনীন করে তোলে। ২০১৯-এ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হ্যান্ডক। তার বিরুদ্ধে সার্বিয়ার নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের বলকান যুদ্ধ সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে।

আবদুলরাজাকের প্রথম তিনটি উপন্যাস হচ্ছে ‘মেমোরি অব ডিপার্চার’(১৯৮৭), ‘পিলগ্রিমস ওয়ে’ (১৯৮৮) এবং  ‘দোতেই ‘ (১৯৯০)। এই তিনটি উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে শরণার্থী বিষয়ক  অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য ইস্যু। তার চতুর্থ উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’ যেটি রচনা করা হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ঔপনিবেশিক পূর্ব আফ্রিকাকে ঘিরে।এটি বুকার প্রাইজের জন্য মনোনীত হয়েছিল। অবশেষে সেই ঊপন্যাসই তাকে নোবেল পুরস্কার এনে দিল। ১৯৯৬ সালে তার উপন্যাস অ্যাডমাইরিং সাইলেন্সে-এ উঠে আসে এক তরুণের জানজিবার ত্যাগ করে ইংল্যান্ডে প্রবেশ, বিয়ে ও শিক্ষক হওয়ার গল্প। ২০ বছর পর নিজ দেশে ফিরে বিয়ে এবং জীবনবোধের গল্প নিয়ে লেখেন  ‘বাই দ্যা সি’ (২০০১) যেটি সালেহ ওমর নামে এক আশ্রয়হীন বালকের কথা, যে সমুদ্রের পাশের এক শহরে বাস করে। ঔপনিবেশিকতাবাদ, দাসত্বের বেড়াজালে আত্মপরিচয় এবং স্থানান্তরের বিষয়গুলো ঠাঁই পেয়েছে আবদুলরাজাকের সাহিত্যকর্মে। শরণার্থীদের জীবন কিভাবে বদলে যায়, নতুন জীবনের সাথে কিভাবে খাপ খায়, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান কিভাবে প্রভাবিত করে জীবনকে, এসব প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর লেখায়। ২০০৪-এ ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ানে এক নিবন্ধে গুরনাহ লেখেন, জানজিবারে থাকার সময় তার সাহিত্যিক হওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না । কিন্তু ইংল্যান্ডে পৌঁছার পর বুঝতে পারলেন তার ফেলে আসা জীবনের কাহিনী তুল ধরা খুবই জরুরি। গুরনাহ ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের অধ্যাপক ছিলেন। সম্প্রতি তিনি অবসরে গেছেন। তার পড়ানোর বিষয় ছিল ইংরেজি ও  উপনিবেশকাল পরবর্তী সাহিত্য। গুরনাহর জীবনের বাঁক বদলে দেয় তার উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি দারুণ প্রশংসিত হয়। উপন্যাসটিতে বিশ শতকের গোড়ার দিকে তানজানিয়ায় এক বালকের বেড়ে ওঠার বর্ণনা রয়েছে । মনে হয়, ঔপন্যাসিক তাঁর নিজের জীবনই তুলে ধরেছেন এখানে। সাহিত্যে যারা নোবেল অর্জন করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, টনি মরিসন, পাবলো নেরুদা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো খ্যাতনামা সাহিত্যিক। তবে প্রথা ভেঙে আত্মজীবনীর জন্য উইনস্টন চার্চিল ও দর্শনশাস্ত্রের জন্য বার্ট্রান্ড রাসেল এবং গীতিকবি ও সংগীতজ্ঞ বব ডিলানকেও সাহিত্যে নোবেল  পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত, সহিংসতা ও রাজনৈতিক কারণে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে । মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণেই এসব মানুষের জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার, নিজ বাসভূমি থেকে হয়েছে বিতাড়িত। এর বৈশ্বিক সমাধান প্রয়োজন। কিন্তু কে করবে সেটি? নোবেল বিজয়ী লেখক মনে করেন, এই পুরস্কারপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে বৈশি^ক শরণার্থী  সংকট  আর ঔপনিবেশিকতাবাদের দুষ্ট ক্ষত হয়তো আলোচনায় আসবে। প্রকৃত আলোচনায় আসলে সমাধানের পথও হয়তো ধীরে ধীর বের হবে। সমাধান দরকার। লেখকের মতো আমরাও তাই আশা করি।

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট : ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)। 

please click here to view dainikshiksha website