‘একটি রাজকীয় কেলেঙ্কারির খসড়া’র লেখক কে? - সম্পাদকের কলাম - দৈনিকশিক্ষা

‘একটি রাজকীয় কেলেঙ্কারির খসড়া’র লেখক কে?

সিদ্দিকুর রহমান খান |

১. ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: যা হয়, যা হয় না’ এমন শিরোনামে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক মানবজমিন অনলাইন একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ডয়েচে ভেলে থেকে নেয়া প্রতিবেদনের শুরুটা এমন, ‘বাংলাদেশে এখন কতটুকু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হচ্ছে? সাংবাদিকরা কি সংবাদের গভীরে ঢোকেন? প্রকাশ করেন?’

২. হুবহু না হলেও মোটা দাগে এরকম: ‘এটা কোনো মামলায় রায় লেখা হয়নি, এটা একটা গরুর রচনা হয়েছে’। সংবিধান ও আইন আদালত বিষয়ক লেখক ও সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান তাঁর এক লেখায় এমন একটা মন্তব্য করেছিলেন। যখন লেখাটি প্রকাশ হয় তখন সেই বিচারক ছিলেন হাইকোর্টে। পরে তিনি প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। তো বিচারপতির রায়কে গরুর রচনা অ্যাখ্যা দেয়ার পর একটা মজার ঘটনা ঘটে। মিজানুর রহমান খানের লেখালেখিতে যাদের ‘আইন-ব্যবসা’ ও ‘আইন বিষয়ক কথিত সাংবাদিকতায়’ মাঝে মধ্যেই ব্যাঘাত ঘটে তারা খুব খুশী! তারা ভাবলেন এটাই বিচারালয় নিয়ে শেষ লেখা। এই লেখাকে আদালত অবমাননা গণ্য করে আইনের কোনো সনদবিহীন সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের লেখালেখির ইতি ঘটাতে হবে। কিন্তু তাদের সে আশার গুড়ে বালি পড়েছিলো! গরুর রচনা হিসেবে অভিহিত করে নিবন্ধ প্রকাশের দুচারদিনের মিজানুর রহমান খানের সঙ্গে সেই বিচারপতির জীবনে প্রথম সাক্ষাত ঘটে হাইকোর্টে সেই বিচারপতির কক্ষে। সেই রায় লেখা বিচারপতি সেদিন তার বাড়ী থেকে তৈরি করে আনা মিষ্টান্ন দিয়ে মিজানুর রহমান খান ও বিচারক মাসদার হোসেনকে আপ্যায়ন করেছিলেন। খাওয়ার ফাঁকে সেই বিচারপতি মিজানুর রহমান খানকে বলেছিলেন, ‘আপনার লেখাটা পড়েছি। একেবারে সত্য লিখেছেন। মামলার রায় লেখায় এত গলদ, এসব নিয়ে যদি আরো আগে থেকে এমন করে কেউ লিখতেন তাহলে হয়তো রায় লেখা নিয়ে আরো সতর্ক হতে পারতাম। তবে, আপনার লেখাটা পাবলিকলি মানে গণমাধ্যমে হওয়ায় কিছুটা হেয় প্রতিপন্ন হয়েছি। যদি আপনার সঙ্গে আমার আগে থেকে পরিচয় থাকতো তাহলে হয়তো ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আপনি আমাদের এসব পর্যবেক্ষণ বলতে পারতেন।” সেদিন এক অন্য উচ্চতার বিচারপতিকে আবিষ্কার করেছিলেন মিজানুর রহমান খান।

৩. আবার আসি দৈনিক মানবজমিনের এরশাদ ও এক বিচারপতির ফোনালাপা নিয়ে ক্যাসেট কেলেঙ্কারির রিপোর্ট প্রসঙ্গে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির মানবজমিন অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “মানবজমিনে ক্যাসেট কেলেঙ্কারি নিয়ে যে মামলা হয়েছিল সেটি এখনো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একজন বিচারপতিকে ফোন করেছিলেন। সেই রিপোর্ট প্রকাশের পর আমাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল ইস্যু হলো। আমরা জবাব দিলাম। আদালতে ক্যাসেট হাজির করলাম। সিনিয়র আইনজীবীরা আমাদের পক্ষে আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেন। কিন্তু হাইকোর্ট আমার এবং সম্পাদক মাহবুবা চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাজার রায় দেন। রায়ে এরশাদকেও ৬ মাসের কারাদ- দেন। আমরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করি। সে আপিল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এরশাদ ইতিমধ্যে মারা গেছেন।’’

পাঠক, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক অ্যাকাডেমিক আলোচনা, পরামর্শ ও মূল্যায়ন হয়। পুরস্কারও পায়। কিন্তু ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে দৈনিক মানবজমিনে ‘একটি রাজকীয় কেলেঙ্কারির খসড়া’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির লেখক কে? তা কি কেউ জেনেছেন? গত বাইশ বছরে মানজমিন কর্তৃপক্ষ হয়তো ওই প্রতিবেদনটি নিয়ে কয়েকশ সাফল্যগাঁথা সাক্ষাতকার দিয়েছে দেশ-বিদেশে। কিন্তু তারা সেই প্রতিবেদকের নাম প্রকাশ করেছেন? রিপোর্ট প্রকাশের কারণে দায়ের করা মামলায় বিচারপতির রায়ে মানবজমিন সম্পাদক ও প্রকাশক সাজা পাওয়ার কথা পাঠক জানতে পারলেন। কিন্তু প্রতিবেদক? বিচারপতির রায়ে প্রতিবেদকের নাম-সাকিন কই? 

পাঠক, আমি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনুসন্ধান করি, লেখালিখি করি। আমি মিজানুর রহমান খান নই। তাই ক্যাসেট কেলেঙ্কারি প্রতিবেদনের প্রতিবেদকের প্রসঙ্গ চেপে যাওয়া ওই রায়টিকে আমি ‘গরুর রচনা’ বা ‘একটি অঙ্গহীন গরুর রচনা’ অ্যাখ্যা দেয়া থেকে বিরত থাকলাম।

পাঠক, ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে যখন মানবজমিনে ‘একটি রাজকীয় কেলেঙ্কারির’ খসড়া প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় তখন গোলাম সারওয়ার সম্পাদিত দৈনিক যুগান্তর একেবারেই নবীন। মিজানুর রহমান খানও দৈনিক যুগান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে আইন-আদালত, সংবিধান, কূটনীতি নিয়ে দুহাতে হার্ড রিপোর্ট ও কলাম লিখে চলছেন।

৪. এরশাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত জনতা টাওয়ার মামলার রায় প্রদানকারী বিচারপতি মু. লতিফুর রহমানের সঙ্গে আসামি হয়েও এরশাদের টেলিফোনে কথা বলা ও এ সম্পর্কিত ক্যাসেটের ঘটনা নিয়ে দৈনিক যুগান্তরেই প্রথম রিপোর্ট লেখেন মিজানুর রহমান খান। যতদূর মনে পড়ে প্রথম রিপোর্টের শিরোনামটা এমন : ‘কী আছে সেই ক্যাসেটে”। প্রথম পাতার আপার ফোল্ডারে সিঙ্গেল কলাম বক্স। বড়জোড় দেড়ইঞ্চি রিপোর্ট। রিপোর্টের বক্তব্য মোটামুটি এমন: ‘একটি ক্যাসেট নিয়ে ঢাকার রাজনৈতিক ও বিচার অঙ্গনে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে। ক্যাসেটে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও একজন বিচারকের কথোপকথন রয়েছে বলে শোনা যায়। সবার জানার আগ্রহ কী আছে সেই ক্যাসেটে।”

পাঠক, যুগান্তরে যখন এই লেখাটি প্রকাশিত হয়, তখন প্রতিবেদনে গ্রামার মানা হয়নি বলেও কেউ কেউ সমালোচনা করে যাচ্ছিলেন। ক্যাসেটের একটা কপি মিজানুর রহমান খানের হাতে থাকলেও খুব সম্ভবত বিচারপতি সংশ্লিষ্ট হওয়ায় প্রথমেই পুরোটা প্রকাশ করেনি। ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে ক্যাসেট কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত বিচারপতি লতিফুর রহমানের পদত্যাগের খবরটিও মিজানুর রহমান খান যুগান্তরে সবার আগে লেখেন। যতদূর মনে পড়ে, ব্যানার হেড লাইনে বিচারপতির নামটা ছিলো না। ব্যারিস্টার থেকে বিচারপতি বাগেরহাটের আওয়ামী লীগ নেতা মু. লতিফুরের নামটা রিপোর্টের তিন অথবা চার নম্বর প্যারায় ছিলো।

৫. বিচারপতির পদত্যাগ নিয়ে তখনও আলোচনা চলছে। ক্যাসেটে এরশাদ ও তার সাবেক ঢাকা সিটি মেয়র ও এলজিআরডিমন্ত্রী নাজিউর রহমান মঞ্জুর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা চলছে। এরই মধ্যে মনীষী লেখক আহমদ ছফার ডিকটেশন নিয়ে তিন/চার পৃষ্ঠার একটা লেখা আমি নিজেই যাই রাজধানীর নিউ বেইলি রোডের ১৫ নম্বর বাড়ীতে। শাহবাগের আজিজ মার্কেটে লেখাটার যখন ডিকটেশন নেই তখনই ছফা ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এটা কোথায় দেবেন? ছফা ভাই বললেন, দেশের বাইরে। বেইলি রোডের সেই বাড়ীতে ঢুকে দেখি সাপ্তাহিক যায়যায়দিন ও মৌচাকে ঢিল নামের দুটো পত্রিকার অফিস। বিখ্যাত সাংবাদিক স্বদেশ রায়ের কাছে লেখাটি দেয়ার জন্য ছফা ভাই আমাকে পাঠিয়েছিলেন। লেখাটি স্বদেশ দার হাতে দেয়ার পর এক নাগাড়ে পড়ে ফেললেন। হাসলেন। আর আমার কাছে জানতে চাইলেন এই লেখাটি কোথায় প্রকাশ হবে জানেন? আমি মাথা নেড়ে না জবাব দিলাম। বললাম ডিকটেশন নেয়ার সময় জানতে চাইলেও ছফা ভাই আমাকে শুধু বলেছিলেন ‘বিদেশে’ ছাপা হবে। স্বদেশ দা বললেন, এই লেখাটা কোলকাতার একটা অনলাইন পত্রিকায় [তখন ইন্টানেট পত্রিকা বলা হতো] প্রকাশ হবে। তারপর বাংলাদেশের কোনও একটা সাপ্তাহিক কাগজের কথা যেন বললেন তা এখন মনে নেই।

কথায় কথায় মানবজমিনের ক্যাসেট কেলেঙ্কারির রিপোর্টের প্রশংসা করলেন স্বদেশ দা। অন্যরকমভাবে লেখা প্রতিবেদনটির তারিফ করলেন। তখন স্বদেশ দাকে জানালাম, ‘ যুগান্তরের যে সাংবাদিক ক্যাসেট বিষয়ে ব্রেকিং নিউজটা করেছিলেন তিনিই বিশেষ অনুরোধে মানবজমিনে ‘একটি রাজকীয় কেলেঙ্কারির খসড়া’ লেখাটিও লিখেছেন। এর পরের ঘটনা প্রকাশ করতে চাই না। একান্ত প্রয়োজন পড়লে করবো।

[ এই লেখাটি দৈনিক আমাদের বার্তার ঈদসংখ্যা ২০২২-এ প্রকাশিত]

সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি, প্রস্তাব নাকচ শিক্ষামন্ত্রীর - dainik shiksha সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি, প্রস্তাব নাকচ শিক্ষামন্ত্রীর বিলবোর্ড ভেঙে জবি ছাত্রী গুরুতর আহত - dainik shiksha বিলবোর্ড ভেঙে জবি ছাত্রী গুরুতর আহত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ৭৮ ভাগ আসনই খালি, নৈরাজ্য চলছে - dainik shiksha পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ৭৮ ভাগ আসনই খালি, নৈরাজ্য চলছে শিক্ষা প্রকৌশলের দুর্নীতি, প্রশ্নের মুখে প্রধান প্রকৌশলী - dainik shiksha শিক্ষা প্রকৌশলের দুর্নীতি, প্রশ্নের মুখে প্রধান প্রকৌশলী একজন শিক্ষার্থীও হাতে পায়নি ইউনিক আইডি, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ - dainik shiksha একজন শিক্ষার্থীও হাতে পায়নি ইউনিক আইডি, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ উৎপাদন করলে ১০ বছরের জেল - dainik shiksha লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ উৎপাদন করলে ১০ বছরের জেল ৩৭ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাকে বদলি - dainik shiksha ৩৭ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাকে বদলি অনার্স ভর্তিতে রিলিজ স্লিপে আবেদন শুরু ১৬ আগস্ট - dainik shiksha অনার্স ভর্তিতে রিলিজ স্লিপে আবেদন শুরু ১৬ আগস্ট please click here to view dainikshiksha website