please click here to view dainikshiksha website

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাখ্যান, আমলাদের দূষলেন শিক্ষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক | জানুয়ারি ৬, ২০১৬ - ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

teacherfederationঅষ্টম পে-স্কেল নিয়ে সৃষ্ট সংকটের জন্য আমলাদের দায়ী করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা। তারা মনে করছেন, হাতেগোণা ৩/৪ জন আমলার পরামর্শেই পে-স্কেলে নতুন সুবিধা দেয়া দূরের কথা, সপ্তম পে-স্কেলের প্রাপ্য সুবিধাও কেড়ে নেয়া হয়েছে।

এমনকি শিক্ষক আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভুল তথ্য দিচ্ছেন সরকারের এসব সুবিধাবাদী আমলারা। আর এ কারণেই সংকট নিরসনে কোনো ধরনের আলোচনায় বসবেন না সিনিয়র সচিব তথা আমলাদের সঙ্গে।

তবে এ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সঙ্গে বসতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। বিদ্যমান সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করতে মুখ্য সচিবসহ কয়েকজন সিনিয়র সচিবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের এ দায়িত্ব দেন।

এদিকে শিক্ষা এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কয়েকটি দাবি পূরণের লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের গ্রেড-১ দিতে হলে মোট কত টাকা লাগবে, তা বের করতে রোববার ও সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। তাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিও যোগ দেন।

তবে শিক্ষকদের প্রধান দাবি ‘অধ্যাপকদের মধ্যে একটি অংশকে সিনিয়র সচিবের সমান বেতনভাতা দেয়া’র দাবি পূরণের বিষয়টি বৈঠকে আলোচনা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিইউটিএ) মহাসচিব অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল মঙ্গলবার দৈনিকশিক্ষাডটকমকে বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা কমানো এবং দাবি পূরণে কয়েকজন আমলাই প্রধান বাধাঁ। তারাই অধ্যাপকদের সুবিধা সপ্তম পে-স্কেলের তুলনায় অর্ধেক করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকেও ভুল বোঝাচ্ছেন তারা। তাই তাদের কাছে সুবিচার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে মন্ত্রিসভা কমিটির একটি বৈঠক হয়েছে। কথা ছিল, কমিটি শিক্ষক প্রতিনিধিদের নিয়ে বসবেন। কিন্তু সেই বৈঠক এখনও হয়নি। তাছাড়া মন্ত্রিসভা কমিটির কার্যকারিতা বাতিল করা হয়নি। আমরা জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বসতে চাই। কেননা, জনগণের প্রতি তাদেরই দায়বদ্ধতা আছে।’

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে শিক্ষকদের আন্দোলনের বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী শিক্ষকদের অসন্তোষ ও আন্দোলনের বিষয়টি উত্থাপন করেন। এসময় এ ঘটনার জন্য আমলাদের দায়ী করা হয়। অভিযোগ করা হয়, মন্ত্রিসভা কমিটিতে যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল তার সব বাস্তবায়ন হয়নি। প্রধানমন্ত্রীও আলোচনায় অংশ নেন।

মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর বেতন স্কেলের সমস্যা নিরসনে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটিতে যেসব সচিব আছেন তাদের নিয়ে একটি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অফিসের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ।

সূত্র জানায়, সিনিয়র সচিবরা এ বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রকৃচি, অন্যান্য ক্যাডার এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সঙ্গে বসবেন।

মঙ্গলবার সমস্যা নিরসনে সিনিয়র সচিবদের দায়িত্ব দেয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এফবিইউটিএ’র মহাসচিব মাকসুদ কামাল বলেন, ‘আমলাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়।’

এদিকে সোমবার রাতে অর্থ মন্ত্রণালয় জাতীয় পে-স্কেল সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। তাতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ দেয়ার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা বলা হয়।

কতজন সরকারি কর্মকর্তা সচিবসহ গ্রেড-১ভুক্ত কর্মকর্তা আছেন আর শিক্ষকদের মধ্যে এ ধরনের সুবিধাভোগী কতজন আছেন- সেই তুলনামূলক তথ্যও প্রকাশ করা হয় এই বিজ্ঞপ্তিতে। এছাড়া এতে সরকারের একজন কর্মচারী কতদিন পর সচিব হিসেবে পদায়ন পান আর একজন শিক্ষক কতদিনে অধ্যাপক হন, উভয়ের অবসরের বয়সসীমা, দায়িত্ব পালনের সময়, অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগের তুলনামূলক চিত্রও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

এই বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বলেন, জনগণকে বিভ্রান্ত এবং শিক্ষকদের অপমান করতে এই বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। এতে সুবিধা দেয়ার যেসব কথা বলা হয়েছে তা নতুন নয়। আমরা আগে থেকেই জানি। সপ্তম পে-স্কেলে মোট অধ্যাপকের ২৫ শতাংশ গ্রেড-১ পেতেন। এখন দেয়া হবে গ্রেড-২ প্রাপ্তদের ২৫ শতাংশ। এতে আগের চেয়ে অর্ধেক অধ্যাপক সুবিধা পাবেন। তাহলে সুবিধা বাড়ানো নয়, কমানো হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। এটা জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা মাত্র।

তিনি বলেন, অষ্টম পে-স্কেলে একটি ক্যাডার ছাড়া আর সবার সুবিধা কমানো হয়েছে।

যদি ওই ক্যাডারের সুবিধাও কমানো হতো, তাহলে পে-স্কেল নিয়ে বাকিদের আপত্তি করার জায়গা থাকত না। আমরা কারও সুবিধা পাওয়ার বিপক্ষে নই। কিন্তু যা ঘটানো হয়েছে কেবল অযৌক্তিক নয়, দৃষ্টিকটু বটে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিক্ষকরা কনসালটেন্সি করেন বা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে থাকেন। এটা শিক্ষারই অংশ। আমলারাও বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে থাকেন। সেই তথ্য আমাদের কাছে আছে।

আর শিক্ষকরা খাতা দেখা, প্রশ্ন প্রণয়নসহ অন্য কাজে যে সুবিধা পান তা আমলাদের সিটিং অ্যালাউন্সের খণ্ডিত অংশমাত্র, সমানও নয়।

শিক্ষকদের ৬৫ বছর পর্যন্ত চাকরি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ভারত, শ্রীলংকা ও ইউরোপে এই একই বিধান আছে। আমেরিকায় এটা ‘আনটিল হ্যাভিং দ্য গুড হেলথ (যতদিন স্বাস্থ্যগতভাবে সক্ষম থাকেন)।

সুতরাং এটা বাড়তি কিছু নয়। তবে সরকার যদি আমলাদের বয়স ৬৫ করতে চান, তাহলে আমাদের আপত্তি নেই। এমনকি আমাদের বয়সও যদি আমলাদের মতো করতে চান, তাহলেও আমরা আপত্তি করব না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনা : এদিকে শিক্ষকদের গ্রেড-১ দেয়াসহ অন্য দাবি পূরণে করণীয় নির্ধারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পৃথক সূত্র জানায়, এ নিয়ে গত রোববার ও সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ৩৭ বিশ্ববিদ্যালয়ে কত শিক্ষক আছেন, তাদের মধ্যে অধ্যাপক কতজন আছেন- এসব তথ্য তুলে ধরেন। পরে সপ্তম পে-স্কেলের মতোই সব অধ্যাপকের ২৫ শতাংশকে গ্রেড-১ দিতে কত টাকা লাগবে কিংবা গ্রেড-২ প্রাপ্ত অধ্যাপকের মধ্যে ২৫ শতাংশকে গ্রেড-১ দিতে কত টাকা লাগবে- সে তথ্য আলাদাভাবে বের করা হয়। একইসঙ্গে বাড়তি অর্থসংস্থান করার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয় বলে সূত্র জানায়।

নাম প্রকাশ না করে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব জানান, বৈঠকে অধ্যাপকদের মধ্য থেকে সিনিয়র সচিবের সমান বেতনভাতা দেয়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কেননা, এ বিষয়ে কোনো বিধান নেই। যদি কোনো বিধান তৈরি হয়, তখন এ নিয়ে আলোচনা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কালো ব্যাজ ধারণ : ৫ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা ৩ জানুয়ারি থেকে কালো ব্যাজ পরে ক্লাস-পরীক্ষা নিচ্ছেন। মঙ্গলবার এই কর্মসূচির তৃতীয় দিন পার হয়েছে। আগামীকাল ৭ জানুয়ারি তাদের এই কর্মসূচি শেষ হবে। এদিন সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বেলা ১১টা থেকে দুই ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচিও আছে। ১০ জানুয়ারির মধ্যে দাবি আদায় না হলে শিক্ষকরা ১১ জানুয়ারি থেকে লাগাতার সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করবেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছেন ফেডারেশনের মহাসচিব মাকসুদ কামাল।

সরকারি কলেজে কর্মবিরতি : ৫ দফা দাবিতে সরকারি কলেজের শিক্ষকরা দু’দিন কর্মবিরতি পালন করেন। মঙ্গলবার তাদের এই কর্মসূচি শেষ হয়। সরাসরি তৃতীয় গ্রেডে অধ্যাপকদের পদোন্নতি দেয়াসহ ৫ দফা দাবিতে তারা সোমবার থেকে এই কর্মসূচি পালন করেন। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির ডাকে পালিত হয় এই কর্মসূচি।

সমিতির মহাসচিব আইকে সেলিমউল্লাহ খোন্দকার জানান, দু’দিন সফলভাবে আমাদের কর্মসূচি পালিত হয়েছে। শিক্ষকরা এই কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। আশা করছি সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দেবে। তিনি বলেন, ২১ জানুয়ারির মধ্যে প্রজ্ঞাপন দিয়ে সরকার সমস্যার সমাধান না করলে ২২ জানুয়ারি আরও কঠোর কর্মসূচি আসতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন