please click here to view dainikshiksha website

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যত গলদ

আমিরুল আলম খান, সাবেক চেয়ারম্যান যশোর শিক্ষা বোর্ড | জানুয়ারি ৩, ২০১৬ - ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

স্বাধীন বাংলাদেশে একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতাম আমরা সবাই। স্বাধীনতার পরপরই যখন গণনকলের মহোৎসব শুরু হয় তখনই হতাশা আমাদের গ্রাস করে। সে সময় পরিকল্পনা কমিশনে শিক্ষার দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

তিনি তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, পরিকল্পনা কমিশন শিক্ষাবর্ষ এক বছর পিছিয়ে স্বাধীন দেশে সকল ছাত্রই যাতে উপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে পারে তার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল। কিন্তু সবাইকে হতবাক করে দিয়ে সে সময়ের শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা

তার পর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। পরীক্ষার হলে শিক্ষকদের উপস্থিতিতেই ছাত্ররা বই খুলে উত্তর লিখে। এই অভাবিতপূর্ব ঘটনায় সকলেই বিস্ময়-বিমূঢ় হলেও শাসকগোষ্ঠী এর মধ্যেই নিজেদের নিরাপদ ভাবতে শুরু করে এবং গণনকল দমন না করে তার আরও ব্যাপ্তি ঘটাতে সহায়কের ভূমিকায় হাজির হয়।

এর পর সব পরীক্ষাতেই চলতে থাকে গণনকল। এভাবে এক ভয়ানক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হলো। ১৯৭২ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ত্রিশ বছর বাংলাদেশে পরীক্ষার হলে চলে প্রকাশ্যে গণটোকাটুকির মহোৎসব। ফলে শিক্ষাজীবনেই ছাত্ররা পথভ্রষ্ট হয়ে চরম অনৈতিকতার শিক্ষা লাভ করে, যা পরবর্তীকালে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটায় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে ভ্রষ্টাচারে নিমজ্জিত করে।

প্রথম থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশে পথ হারায় গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা। তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার আন্তরিক কোনো চেষ্টা কখনও লক্ষ্য করা যায়নি। শিক্ষার নামে গত সাড়ে চার দশকে চালু করা নানা কিসিমের ব্যবস্থায় শুধু ধনী ও ক্ষমতাবানদের সন্তানদেরই শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

চরম বৈষম্যমূলক এক শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। আজতক সেই বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে এবং দিনে দিনে তা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে দামি পণ্য হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। দুটোই নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অথচ এই দুই মৌলিক অধিকার থেকে নাগরিকরা বঞ্চিত।

দেশের সাধারণ মানুষের জন্য চালু করা হয়েছে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা কোনো শিশুকে না নৈতিকতা শেখায়, না তাদের দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তরিত করে। দেশপ্রেমিক না করে এই শিক্ষা তাদের গড়ে তোলে দেশবৈরী এমন এক শ্রেণী হিসেবে, যারা লুটপাটের মাধ্যমে ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে এহেন খারাপ কাজ নেই যা তারা করতে পারে না। বলা যায়, শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত শিক্ষা ব্যবস্থা না আধুনিক, না সনাতন। এ এক জটিল প্রশ্ন।

সাধারণ মানুষের জন্য আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার নামে গত সাড়ে চার দশকে ব্রিটিশ বাংলায় প্রচলিত সনাতন শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা হয়েছে, কিন্তু পুনর্র্নিমাণের কোনো প্রচেষ্টাই গ্রহণ করা হয়নি।

সমাজের সবচেয়ে গরিব ও পিছিয়ে থাকা মানুষদের বাধ্য করা হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষা গ্রহণ করতে, যেখানে ধর্মভীরু মানুষ আল্লাহর ওয়াস্তে যে যা পারে দান-খয়রাত করে। মাদ্রাসা শিক্ষার পেছনে এই অতি গরিব শ্রেণীর মানুষেরই প্রধান অবদান।

রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত তাকে অভিসম্পাত করে, কিন্তু তার আধুনিকায়নে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে না।

দেশের শতকরা ৭০ ভাগ মানুষের জন্য জারি রাখা হয়েছে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে বিরাজ করছে চরম অব্যবস্থা। হালে যুক্ত হওয়া কারিগরি শিক্ষা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কারিগরি ক্ষেত্রে দক্ষ করার পরিবর্তে সার্টিফিকেটধারীতে পরিণত করেছে। অথচ সঠিক পরিকল্পনা করে তরুণ শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা যেত।

সাধারণ শিক্ষা শুরু হয় সরকার পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাদের সন্তানদের এই সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পাঠায়। তারা যেন দেশের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক। গ্রাম ও শহরের খেটে-খাওয়া মানুষ, যারা প্রতিদিন কায়িক শ্রম বিক্রি করে কোনো রকমে বেঁচে আছে, ছোট চাষি, গরিব শিক্ষক, ছোট ব্যবসায়ী, সিএনজি-রিকশা-ভ্যান-নছিমন চালকদের সন্তানদের জন্য এই তথাকথিত ‘ফ্রি’ লেখাপড়া। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলগুলোতে তবু শিক্ষার্থী আছে, কিন্তু শহরের সরকারি প্রাইমারি স্কুলের অবস্থা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। শহুরে সচ্ছল শ্রেণী এসব সরকারি প্রাইমারি স্কুলকে ঘৃণার চোখে দেখে এবং সেখানে তাদের সন্তানদের পাঠানোর কথা কল্পনা করতেও ভয় পায়। পথশিশুরা সেখানে পড়তে আসে। তাই সেসব স্কুলের অবস্থা ভাগাড়ের চেয়েও খারাপ।

গ্রামের সম্পন্ন কৃষক, ইউনিয়ন পরিষদের অবস্থাপন্ন মেম্বার-চেয়ারম্যান, সম্পন্ন শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক টাউট, চোরাচালানি, থানার দালাল, অপেক্ষাকৃত কম ধনী ডাক্তার, প্রবাসী কর্মজীবীরা তাদের সন্তানদের পাঠায় ‘কিন্ডারগার্টেনে’ এবং পরে সাধ্য ও সুবিধামতো ক্যাডেট কলেজ, জিলা স্কুল বা সরকারি মাধ্যমিক স্কুল, নানা রঙের মিলিটারি পাবলিক স্কুল, শহরের নামিদামি স্কুল-কলেজে। এই শ্রেণীকে আমরা আদর করে ডাকি ‘মধ্যবিত্ত’ বলে। তারা আমাদের সমাজের প্রায় ১৫ ভাগে উন্নীত। বলে রাখা ভালোথ মধ্যবিত্ত শ্রেণীই গত শতকের মাঝামাঝি আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিল এবং তারাই এদেশে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠতে সচেষ্ট। মধ্যবিত্ত এই শ্রেণীকে আবার করপোরেট পুঁজি খুবই পেয়ার করে। কেননা, তাদের আয়তন যত বাড়ে, করপোরেট পুঁজির ব্যবসা তত রমরমা হয়। তাই এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রসারে রাষ্ট্র এবং বিদেশি মুরব্বিরা খুবই খুশি ও যতœবান। এরা সমাজের প্রায় ১৫ ভাগ, কিন্তু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধার ৪০/৪৫ ভাগ তারাই ভোগ করে।

আর সমাজের উপরতলার লোকেরা তাদের সন্তানদের কোথায় পড়ায়? না; দেশে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় এই শ্রেণীর মানুষের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। তাই ধনী ও ক্ষমতাবানদের দুলালরা যায় বিদেশি সিলেবাসের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। আমাদের দেশে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল কোর্স করে তারা। ব্রিটিশ কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে তাদের পড়াশোনা, পরীক্ষা গ্রহণ চলে। আর সে পরীক্ষা নির্বিঘ্ন করতে দেশের সব রাজনৈতিক দলই হরতালের মতো কর্মসূচিতেও ছাড় দেয়। তার পর তাদের লেখাপড়া হয় বিদেশের মাটিতে। মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশের নিচে এই বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণী, কিন্তু তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্তত ৪০/৪৫ ভাগ সুবিধা ভোগ করে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তানরা দেশে প্রাপ্য সুবিধার ৮৫/৯০ ভাগ ভোগ করে। অন্যদিকে, প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য পায় মাত্র ১০-১৫ ভাগ সুযোগ-সুবিধা। অথচ, সরকারের মায়াকান্না সব সময় এই বঞ্চিত ৮০ ভাগ মানুষের জন্য, যাদের জন্য শাসকগোষ্ঠী কিছুই করে না।

অবশিষ্ট ১০-১৫ ভাগ সুবিধা ভাগাভাগি করে নিতে হয় সমাজের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ, ৮০-৮৫ ভাগ সাধারণ মানুষকে। শিক্ষা নাগরিকের মৌলিক অধিকার হলেও দেশের এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই আসলে উচ্ছিষ্টভোগী।

আমাদের সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ একটি ঘোষিত নীতি। এর অর্থ যদি এই হয়থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়ে সকল নাগরিক সমঅধিকার ভোগ করবে তাহলে সংবিধানের মৌলনীতি ‘সমাজতন্ত্র’ শুধুই ছেলে-ভুলানো বুলি আর ধাপ্পা ছাড়া কিছুই নয়।

বিগত সাড়ে চার দশকে শাসক শ্রেণী বাংলাদেশে শিক্ষাকে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছে। শাসক শ্রেণীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গত সাড়ে চার দশকে শিক্ষাকে পরিণত করা হয়েছে সবচেয়ে দামি পণ্যে। বিশ্বব্যাংক আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পরামর্শ মেনে তারা শিক্ষাকে লাভজনক ব্যবসায়ে পরিণত করতে উন্মাদ হয়ে উঠেছে।

দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণ করে সরকার বাহবা কুড়ায়, যা একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা-ব্যয়ের ১০ ভাগের এক ভাগও নয়। সরকারের কৃতিত্ব হলো বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া। এ জন্য অবশ্যই সরকার বাহবা পেতে পারে। কিন্তু সে পুস্তক কতটা যুগোপযোগী, কতটা মানসম্পন্নথ সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অভিযোগ আছে, সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করে যে পাঠ্যপুস্তক রচনা ও প্রকাশ করে তা ভুলে ভরা। তার ওপর সে পুস্তক ক্লাসরুমে ব্যবহার করার জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করা যায়নি।

গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোচিংনির্ভর ও ব্যয়বহুল করে সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষার দরজা কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক সমাপনী ও জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষার নামে শিশুদের ওপর চালানো হচ্ছে সীমাহীন নির্যাতন।

গরিব মানুষের ওপর আর্থিক জুলুম চাপানো হয়েছে। বাংলা ভাষা শিক্ষা এখন এদেশে সবচেয়ে উপেক্ষিত এবং ইংরেজি ভাষা তাদের ওপর জবরদস্তিমূলক চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার সঙ্গে সাধারণ জ্ঞানের নামে মুখস্থবিদ্যার এক ভয়ঙ্কর দৈত্য তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে স্কুলগুলো। আর সৃজনশীল পরীক্ষার নামে ধ্বংস করা হচ্ছে শিশুমেধা। তথাকথিত সৃজনশীল বিদ্যা দেশে নোট-গাইড আর কোচিং ব্যবসারই প্রসার ঘটিয়েছে। শিক্ষার বারোটা বাজিয়ে অবাধে লুটপাট চলছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

এখন এটা স্পষ্টথ বাংলাদেশে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ নিছক একটি স্লোগান। সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষার দরজা উন্মুক্ত না করে ক্রমেই তা দুর্মূল্য পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে। এই সুযোগে বিদ্যাবাণিজ্যের বণিকরা লুট করে নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। আর শাসকগোষ্ঠী তার পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছে মাত্র। একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বিকাশের জন্য এই শিক্ষা ব্যবস্থা কখনোই সহায়ক হতে পারে না।

আমিরুল আলম খান, সাবেক চেয়ারম্যান যশোর শিক্ষা বোর্ড|

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন