please click here to view dainikshiksha website

উপাচার্য নিয়োগে নিয়ম না মানার প্রবণতা

নিজস্ব প্রতিবেদক | আগস্ট ৪, ২০১৭ - ১:১০ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়ম না মানার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত উপাচার্য প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগ পাওয়ার কথা।

কিন্তু সব সময় সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে উপাচার্য প্যানেল তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এছাড়া প্যানেল তৈরি হলেও এক্ষেত্রে নানা অনিয়ম হয়-এমন অভিযোগ রয়েছে।

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ ১১(১) ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্ধারিত শর্ত ও শর্তাবলী অনুযায়ী সিনেট কর্তৃক মনোনীত তিন ব্যক্তির প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য পদে চার বছর মেয়াদে নিয়োগ দেবেন।

সিনেট থেকে প্যানেল না পাঠালেও ১১(২) ধারায় নিয়োগ দিতে পারেন রাষ্ট্রপতি। এই ধারা অনুযায়ী ছুটি, অসুস্থতা, পদত্যাগ বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি অস্থায়ীভাবে কাউকে এ পদে নিয়োগ দিতে পারবেন। গত ৭ মে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয় ১১(২) ধারা অনুযায়ী। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান ৭৩ এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী অন্যসব নির্বাচন হলেও উপাচার্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েকটার্মে উপাচার্য নিয়োগে নিয়ম মানা হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী ঢাবিতে কোরামপূর্ণ সিনেট অধিবেশনে সদস্যদের ভোটে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের কথা। কিন্তু গত তিন টার্ম উপাচার্য নির্বাচনে আইন যথাযথভাবে মানা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী সিনেটের মোট সদস্য ১০৫ জন। এর মধ্যে থাকবেন উপাচার্য, দুজন সহ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, সরকার মনোনীত পাঁচজন সরকারি কর্মকর্তা, জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত পাঁচজন সংসদ সদস্য, আচার্য মনোনীত পাঁচজন শিক্ষাবিদ, সিন্ডিকেট মনোনীত পাঁচজন গবেষক, একাডেমিক কাউন্সিল মনোনীত অধিভুক্ত কলেজের পাঁচজন অধ্যক্ষ ও ১০ জন শিক্ষক, ২৫ জন নির্বাচিত রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট, ৩৫ জন নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি এবং ডাকসু মনোনীত পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি।

সাবেক উপাচার্য ও শিক্ষকরা বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এমনকি এরশাদের সময়ও সিনেট পূর্ণ ছিল। গণতান্ত্রিক সরকারের সময় ১৯৯৬ সালে সিনেট অধিবেশনে ৭৮ জন উপস্থিত ছিলেন। ২০০৪ সালে ছিলেন ৮৫ জন। ২০০৯ সালে অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সাময়িক সময়ের জন্য উপাচার্য হন। কিন্তু চার বছর মেয়াদি এই পদ তিনি চার বছর সাত মাস পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান। এরপর ২০১৩ সালের ২৪ আগস্ট রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন এবং সব মনোনীত পদ পূরণ না করেই সিনেট অধিবেশন ডাকেন বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক। যে সিনেটে ১০৫ জন থাকার কথা, সেখানে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৩৬ জন।

গত ২৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের জন্য সিনেট অধিবেশন বসে। সিনেটে মোট সদস্য ছিলেন ৫৫ জন। সিনেটে ৫০টি পদ শূন্য থাকে। এর মধ্যে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ২৫ জন, পাঁচজন গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধি, পাঁচজন অধিভুক্ত ও উপাদানকল্প কলেজের অধ্যক্ষদের প্রতিনিধি, একাডেমিক পরিষদের মনোনীত ১০ জন ও পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধির পদ শূন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ১০০ কলেজ থাকা সত্ত্বেও সেখান থেকে ১৫ জনকে মনোনীত করতে দেওয়া হয়নি। একইভাবে ৪৪ হাজার রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে ২৫ জন প্রতিনিধি রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচন অনুষ্ঠান করেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলেই রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিসহ অন্যান্য শ্রেণির প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারত। কিন্তু প্রশাসন সেই পথে না গিয়ে অনেকটা একতরফাভাবে তিনজনের প্যানেল নির্বাচন করেছে।

উপাচার্য নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে সিনেট সদস্য অধ্যাপক ড. এ জে এম শফিউল আলম ভূইয়া বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে কখনো অনিয়ম হয় না। এখানে দুইভাবে উপাচার্য নিয়োগ হয়। একটা হলো সাময়িকভাবে আচার্য কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন। আর দ্বিতীয়টি হলো সিনেটে উপাচার্য প্যানেল নিবাচনের মাধ্যমে। নির্বাচনের সময় এবারের প্যানেল কোরামপূর্ণ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বলেন, ‘আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হোক। কিন্তু সিনেট অধিবেশনে নিয়ম না মেনেই প্যানেল নির্বাচন করা হয়। উপাচার্য নির্বাচনের জন্য মনোনীত তিন সদস্যের প্যানেলের পরবর্তী কার্যক্রম স্থগিত করেছে হাইকোর্টের আপিল বিভাগ। অনিয়ম যেনো না হয় সেই বিষয়ের জয় হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করবো ভবিষ্যতে সংবিধান মেনেই উপাচার্য নিয়োগ হবে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ২৫ বছর যাবত্ সিনেট নির্বাচন ছাড়াই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সিনেট উপাচার্য মনোনয়ন করবে সে সিনেটকেই করে রাখা হয়েছে অকার্যকর। ৭৩-এর অধ্যাদেশকে অমান্য করে ক্ষমতাসীন দলগুলো গত ২৫ বছর ধরেই পছন্দের ব্যক্তিকেই উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ এর ধারা ভেঙে নির্বাচন ছাড়াই সরকার দলীয় বিবেচনায় বছরের পর বছর উপাচার্য পদে বহাল রয়েছেন তারা। অধ্যাদেশ অনুযায়ী সিনেট সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত এবং আচার্যের মনোনীত একজন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করবেন। কিন্তু বিগত দুই দশক ধরে দলীয় বিবেচনায় নিজেদের পছন্দের উপাচার্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছে সরকারগুলো। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষেত্রেও চলছে একই পদ্ধতি।

১৯৯১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দমতো উপাচার্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার। এরপর থেকে একই ধারায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১৫ জুন নিয়োগ পান আওয়ামীপন্থি শিক্ষক প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, তিন বছর পর পর সিনেটের শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও সর্বশেষ এ নির্বাচন হয় ২০০১ সালে। সর্বশেষ তিন বছর মেয়াদী রেজিস্টার্ড গ্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন হয় ১৯৮৬ সালে। চাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গত তিন মেয়াদের উপাচার্যের মধ্যে ২০০৯ সালে অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির ছিলেন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত উপাচার্য। এছাড়া অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বেশিরভাগ মেয়াদ উত্তীর্ণ সিনেট সদস্যের ভোটে ভিসি প্যানেলের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর মধ্যে অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম ৯৩ জন সিনেট সদস্যের মধ্যে ৭৮ জন মেয়াদ উত্তীর্ণ সদস্যের ভোটে ভিসি প্যানেল নির্বাচনে তালিকায় এক নম্বরে ছিলেন। এসময় দ্বিতীয় হয়েছিলেন অধ্যাপক আবুল হোসেন ও তৃতীয় হয়েছিলেন অধ্যাপক আমির হোসেন। পরে তাকে দেশের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে ২০১৪ সালে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। অন্যদিকে এর আগে ২০১২ সালে একইভাবে বেশিরভাগ মেয়াদ উত্তীর্ণ সিনেট সদস্যের ভোটে ভিসি প্যানেল নির্বাচনে ২য় স্থান অর্জন করেন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন। এসময় প্রথম হয়েছিলেন আগের মেয়াদের ভিসি অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীর ও ৩য় হয়েছিলেন অধ্যাপক নুরুল আলম। এসময় ৯৩ জন সিনেটরের মধ্যে ৬৩ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। পরে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৩ জন সিনেট সদস্যের মধ্যে ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট সদস্যের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০০১ সালে। যারা ২০০১ সালের পরে সকল ভিসি প্যানেল নির্বাচনে ভোট প্রদান করেছেন মেয়াদ উত্তীর্ণ থেকেও। এছাড়া সিনেটে জাকসু কর্তৃক নির্বাচিত ৫ জন ছাত্র প্রতিনিধি না থাকায় গত তিন মেয়াদের উপাচার্য নির্বাচনের সময় কোন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

গত ১৬ বছর ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে কোনো নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সবশেষ গত ১৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গত ৭ মে অধ্যাপক আব্দুস সোবহানকে দ্বিতীয়বারের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

২০০১ সালের পর থেকে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। পরে সিনেট অধিবেশনের প্যানেল নির্বাচন ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ফাইসুল ইসলাম ফারুকী, অধ্যাপক আলতাফ হোসেন, অধ্যাপক আব্দুস সোবহান ও অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন উপাচার্যের দায়িত্ব পান। গত ৭ মে দ্বিতীয় বারের মতো অধ্যাপক আব্দুস সোবহান উপাচার্য হন।

(রিপোর্ট তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি কবির কাকন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মোস্তফা রনি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মেহেদী হাসান ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নিলয় মামুন)

সংবাদটি শেয়ার করুন:


পাঠকের মন্তব্যঃ ১টি

  1. মোঃ হবিবর রহমান, প্রভাষক, পরিসংখ্যান, বীরগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ, দিনাজপুর। says:

    বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগে যদি এরকম অনিয়ম হয় তাহলে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ নিয়োগে কি হতে পারে ভাবলেই গা ছমছম করে।
    এখনও সময় আছে। নিয়মে আসার চেষ্টা করুন।

আপনার মন্তব্য দিন