please click here to view dainikshiksha website

প্যারিসে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক | আগস্ট ৯, ২০১৭ - ৬:১৯ অপরাহ্ণ
dainikshiksha print

আশরাফুল ইসলাম ফ্রান্সপ্রবাসী ২৬ বছর হলো। এই প্রবাসজীবনে তিনি বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেক অনুষ্ঠান হতে দেখেছেন। কিন্তু বিসিএফ-এর আয়োজনের অভিনবত্ব ও ইতিবাচক দিকটি তাঁকে বেশ মুগ্ধ করেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়ার এ আয়োজনটি এ দেশের মাটিতে তিনি এই প্রথম দেখলেন। সে কারণেই তিনি মুগ্ধ।

ফ্রান্সে বসবাসকারী বাংলাদেশি পরিবারের সন্তানেরা এ দেশে পড়াশোনা করে যারা ভালো ফলাফল করেছে এবং বাংলাদেশ থেকে আসা যেসব শিক্ষার্থী এ দেশে ব্যাচেলর, মাস্টার্স, ডক্টরাল বা পোস্ট ডক্টরাল পর্যায়ের ফলাফলে সাফল্যের সাক্ষর রেখেছেন সেই সব মেধাবীদের সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন ফ্রান্স (বিসিএফ) নামের বাংলাদেশি একটি অনলাইনভিত্তিক সংগঠন। এই আয়োজনটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভেতর ব্যাপক আলোড়ন তোলে। গত ৪ আগস্ট শুক্রবার প্যারিসের একটি সুপরিসর অডিটোরিয়ামে কানায় কানায় পূর্ণ বাংলাদেশির উপস্থিতিতে এ অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়।

আশরাফুল ইসলাম মূলত পরিচিত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। কিন্তু তিনি সেদিন সেই পরিচয়ে পরিচিত হতে আসেননি। দিয়ান আশরাফুল তাঁর মেয়ে। সুদর্শনা ও স্মার্ট এবং চেহারায় একটি আস্থার দীপ্তির উজ্জ্বল আভা। এবারের BAC পরীক্ষায় প্যারিসে অত্যন্ত ভালো ফলাফল করে বিখ্যাত শরবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আশরাফুল ইসলামকে নিজ হাতে তাঁর মেয়েকে একটি ক্রেস্ট তুলে দেওয়ার জন্য আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। সাফল্যের একটি প্রতীকী স্মারক। সেদিন মঞ্চে তিনি তাঁর রাজনীতির পরিচয়টা একেবারেই আড়াল করে ফেলেছেন। কারণ দিনটি ফ্রান্সপ্রবাসী বাঙালি কমিউনিটির জন্য একটি আলোকিত দিন। প্যারিসের আকাশ সেদিন প্রবাসী বাংলাদেশির এই প্রজন্মের মেধাবী মুখ দিয়ে অপরূপ সাজে সেজেছে। এ আকাশটি একটি মেধাভিত্তিক প্রজন্মের বহুমাত্রিক এবং বহুবর্ণিল তারায় খচিত।

কেবল তিনিই নন, আকাশ মোহাম্মদ হেলালের মা এবং বাবা শফিক উদ্দিন এসেছেন। শফিক উদ্দিন ফ্রান্সে এসেছেন ১৮ বছর হয়ে গেল। তার আবেগটাও একই রকম এই প্রশংসনীয় আয়োজনকে ঘিরে। প্যারিসের ওই অডিটোরিয়াম মেধাবী মুখ আর তাঁদের গর্বিত বাবা-মায়ের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল।

জীবন আর জীবিকার তাগিদে মানুষকে পরিযায়ী হতে হয়। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতি, ভিন্ন ধর্মীয় আচার আর সামাজিক মূল্যবোধের ঘাত-অভিঘাতের জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম বেড়ে ওঠে। বাবার ঘড়ির কাটায় জীবন বাঁধা। বাবা যখন কাজে যান, সন্তান তখন ঘুমিয়ে। গভীর রাতে কর্মক্লান্ত বাবা যখন বাসায় ফেরেন সন্তান তখনো ঘুমিয়ে। সন্তানের ঘুম-সমর্পিত গালে কেবল একটি চুম্বন একে দেওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। সন্তান তাঁর আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত। সেই সন্তানেরা অভিজ্ঞ ফরাসি শিক্ষক আর মায়ের নিরলস চেষ্টায় বিশ্বমানের শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠছে। আমরা স্বাপ্নিক হয়ে উঠি, আমাদের আশাবাদ এরা যেন ইউরোপীয় ভূখণ্ড ছাপিয়ে অস্তিত্বের শিকড়মুখী হয়ে বাংলাদেশকে ছুঁয়ে যায়।

রত্নগর্ভা বাবা-মায়েরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিলিয়ে দেন সন্তানের নিরাপদ মজবুত ভবিষ্যতের জন্য। লেখাপড়া করে সন্তানটি কমিউনিটিতে তাঁর মুখ উজ্জ্বল করবে, এ দেশকে মেধা-শ্রম-ঘাম দিয়ে গড়ে তুলবে। বাংলাদেশ—যেখানে তাঁর অস্তিত্বের শিকড়টি প্রথিত তাকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তুলবে ভিন্ন মাত্রায়। যে অবয়বটি বিদেশিদের কাছে নিতান্ত অপরিচিত। ধারণার অতীত এক আলোকিত বাংলাদেশকে পরিচিত করবে এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা। ইউরোপীয় ধাঁচের আধুনিক শিক্ষা নিয়ে সন্তান বেড়ে উঠবে। এ দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি আর সমাজনীতিতে দৃঢ় ভূমিকা রাখবে।

পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অভিবাসী হয়ে আসা জাতিগোষ্ঠীর সন্তান এবং খোদ ফরাসিদেরও পেছনে ফেলে আসা এই মেধাবীদের সাফল্যগাথা কি কেউ আগে জানত? বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এর জবাব নিশ্চিতভাবে না বোধক।

এই প্রবাসে আমাদের একটি সাধারণ ধারণা, আমরা এক মেধাহীন ওড জব বা অর্ডিনারি জব করে আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর যুদ্ধ নিয়ে জীবন চালিয়ে যাচ্ছি। এটি আংশিক সত্য। মূল সত্য হলো, মেধাবীরাও এখানে এসেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মতো মেধাবী ব্যক্তিত্বরা এখানে এসেছিলেন। এখানে বাস করছেন শিল্পী শাহাবুদ্দীন ও পার্থপ্রতিম মজুমদাররা। এ দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স, মাস্টার্স আর ডক্টরেট পর্যায়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন আর হাতে গোনা সম্ভব নয়। আর ওদের মেধার পরিমাপ আমরা ফলাফলেই পাচ্ছি।

এ দেশে মেধা আর অধ্যবসায় দিয়ে রাহাত খানেরা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স ডক্টরেট-পোস্ট ডক্টরেট করেন আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ওপর কাজ করেন, ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করছেন রাকীব বেপারি। আকাশ মোহাম্মদ হেলাল আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে সাফল্য দেখান। এমডি ইব্রাহীম করছেন ডক্টরেট। সাব্বির হোসেইন পিএইচডি শেষ করেছেন ইতিমধ্যেই।

এ দেশের সরকারি বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। আর এই প্রজন্মের সন্তানেরা এ দেশে পড়াশোনা করে, ভালো ফলাফল করে আরও অধিক মাত্রায় এবং সম্মানজনক কাজ করে এ দেশকে যেমন গড়ে তুলবে তেমনি বাংলাদেশের মুখও উজ্জ্বল করবেন। এইতো আমাদের বর্তমানের আলোকিত প্রজন্ম। আমাদের অহংকারের জায়গাগুলো।

মোট চার ক্যাটাগরিতে ভাগ করে এ সংবর্ধনা দেওয়া হয়। আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন সত্তরের দশকে স্কলারশিপ নিয়ে এ দেশে পড়তে আসা হাসনাত জাহান, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব টি এম রেজা, বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধি আবুল হোসেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আশরাফুল ইসলাম ও প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের নেতা হান্নান মোহাম্মদ।

অনুষ্ঠান আয়োজনের আর্থিক জোগানদাতা আভেক রাব্বানী, ক্যাফে রয়াল ও শাহ আলম প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন হাসনাত জাহান, এমডি নুর, ওয়াসিউজ্জামান, ওয়াহিদুজ্জামান টিপু, টি এম রেজা, আবুল হোসেন ও হান্নান মোহাম্মদ প্রমুখ।

এমন একটি ভিন্নধর্মী আয়োজনের পেছনে কারণ কি এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল বিসিএফ-এর মূল কুশীলব এমডি নুরের কাছে। তিনি জানালেন, প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি তরুণ-যুবকেরা এ দেশে পড়াশোনা করে ভালো ফলাফল করছে। কিন্তু কমিউনিটিতে এ রকম একটি আশাব্যঞ্জক খবর জানা নেই। এখানে হানাহানি, দলবাজি, গ্রুপিংয়ের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ক্রিয়াশীল, যা আমাদের পীড়া দেয়। আমাদের যে একটি আলোকিত দিক আছে, গর্বের একটি জায়গা আছে এবং তাদের সন্মানিত করে উৎসাহ দেওয়ার একটি কর্তব্য আছে সেই তাগিদ ও দায়বোধ থেকে এই আয়োজন। দ্বিতীয়ত, এই প্রজন্মের তরুণ-যুবারা ইউরোপীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠছে, এরা যেন বড় হয়ে তাদের নাড়ির কথা তথা বাংলাদেশের কথা ভুলে না যায় সেই চেতনাবোধটা জাগরুক রাখার গুরুত্ব উপলব্ধির থেকেও এই আয়োজন। এটি প্রতিবছরই আমরা চালিয়ে যাব। তৃতীয়ত, বর্তমান প্রজন্ম যেন আগের প্রজন্মকে ভুলে না যায়, তার জন্যও এই আয়োজনটি করা, অর্থাৎ দুই প্রজন্মের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপন করা। এমডি নুর এমনভাবেই এর গুরুত্ব তুলে ধরলেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন