মাদ্রাসার জনবল কাঠামো সংশোধন প্রয়োজন কেন?

জহির উদ্দিন হাওলাদার : | জানুয়ারি ১০, ২০১৭ - ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

মাদরাসার জনবল কাঠামো স্কুল-কলেজের জনবল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। প্রশ্নবিদ্ধ জনবল কাঠামো দিয়ে যুগ-যুগ ধরে চলছে মাদরাসার প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম। ষাটের দশকের মাদরাসার সাথে বিংশ শতাব্দীর মাদরাসার খুব একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বর্তমানে অনেকটাই বদলে গেছে সিলেবাস ও শিক্ষানীতি শুধু আশানুররূপভাবে বদলায়নি জনবল কাঠামো। সর্বশেষ প্রকাশিত জনবল কাঠামো মোতাবেক স্নাতক (পাস) কলেজে বাংলা, ইংরেজি (আবশ্যিক) ও প্রতিটি ঐচ্ছিক বিষয়ে প্রভাষক/ সহ:অধ্যাপক পদ সংখ্যা ২টি করে কিন্তু, সমমানের ফাজিল (পাস) মাদরাসায় উপর্যুক্ত বিষয় সমুহে প্রভাষক/সহ:কারী অধ্যাপক পদসংখ্যা ১টি করে। এছাড়া কলেজে অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান, দর্শন, সামাজিক বিজ্ঞানসহ প্রতিটি ঐচ্ছিক বিষয়ে ২জন করে বিষয়ভিত্তিক প্রভাষক/সহ:অধ্যাপক নিয়োগ করা যায় অথচ মাদরাসায় সবগুলো ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্য থেকে মাত্র একটি বিষয়ে একজন প্রভাষক নিয়োগ করা যায়।

এটি একটি অমানবিক, অগণতান্ত্রিক ও প্রহসনমূলক সিদ্ধান্ত। স্নাতক (পাস) কলেজে, আই.এসসি ও বি.এসসি চালু থাকলে (পদার্থ, রসায়ন, গণিত ও জীব) বিজ্ঞানের প্রতিটি বিষয়ে দুইজন করে প্রভাষক/সহ:অধ্যাপক, একজন করে প্রদর্শক ও একজন করে ল্যাব পিয়ন নিয়োগ করা যায় অথচ সমমানের প্রতিষ্ঠান ফাজিল (পাস) মাদরাসায় বিজ্ঞান বিভাগ চালু থাকলে প্রতিটি বিষয়ে একজন করে প্রভাষক নিয়োগ করা যায় কিন্তু কোন প্রদর্শক ও ল্যাব পিয়ন নিয়োগ করা যায় না কারণ মাদরাসার জনবল কাঠামোতে প্রদর্শক ও ল্যাব পিয়নের কোন পদ অন্তর্ভূক্ত নেই। তাই মাদরাসায় একজন বিজ্ঞান বিষয়ের প্রভাষককে একাই প্রভাষক, প্রদর্শক ও পিয়নের কাজ করতে হয় যা একজন বিজ্ঞান প্রভাষকের জন্য অত্যন্ত অমর্যাদাকর এবং মানসিক নির্যাতনের শামিল। স্নাতক (পাস) কলেজে এমএলএসএস পদ সংখ্যা ৯টি। কিন্তু ফাজিল (পাস) মাদরাসায় এমএলএসএস পদ সংখ্যা ৪টি। এখানেও একজন কর্মচারীকে দুইজনের বা তারও বেশি দায়িত্ব পালন করতে হয়।

এছাড়াও স্নাতক (পাস) কলেজে গ্রন্থাগারিক একজন, সহকারি গ্রন্থাগারিক একজন, অফিস সহকারি কাম হিসাব সহকারী একজন ও নিম্নমান সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর দুই জন নিয়োগ করা যায় অথচ ফাজিল (পাস) মাদরাসায় জনবল কাঠামোতে গ্রন্থাগারিক পদ নেই এবং নিম্নমান সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর দুইজনের স্থলে একজন নিয়োগ করা যায়। এখানেও দেখা যায় একজন গ্রন্থাগারিক ও একজন অফিস সহকারিকে দ্বিগুন কাজ করতে হয়। এরকমই মাদরাসার জনবল কাঠামোর প্রতি পরতে পরতে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির গড়মিল। আরও বড় শুভংকরের ফাঁকি আছে মাদরাসার প্রশাসনিক পদ (সহ:সুপার, সুপার, উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ) পদের নিয়োগ বিধিতে। ২০১০ সালের পরিপত্রে উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পদে সাধরণ শিক্ষক নিয়োগের কোন সুযোগ ছিল না, যা মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় কালো আইন হিসাবে অভিহিত।

পরবর্তীতে এই কালো আইনের অবসান ঘটে ২০১২ সালের পরিপত্র প্রকাশের মাধ্যমে। যেখানে আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ পদের জন্য মাদরাসায় ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা এবং ফাজিল/কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদের জন্য যথাক্রমে মাদরাসায় ১৫ ও ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, যার মাধ্যমে মাদরাসায় কর্মরত সকল অ্যারাবিক এবং নন্ অ্যারাবিক শিক্ষক মাদরাসার প্রশাসনিক পদে নিয়োগ নিতে পারতেন। আকষ্মিকভাবে ২০১৩ সালে সংশোধিত পরিপত্র প্রণয়ন করা হয় যাতে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদের জন্য যথাক্রমে ১৫ ও ১২ বছর আরবি বিষয় সমূহে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। যার ফলে শুধু আরবি বিষয়সমূহের শিক্ষকগণ অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ নিচ্ছেন কিন্তু বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ মাদরাসায় শিক্ষকতা করার পরেও একজন সাধারণ শিক্ষক প্রশাসনিক পদ বঞ্চিত হচ্ছেন। বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার ২০১৩ সালের সংশোধিত পরিপত্র রহিত করে ২০১২ সালের পরিপত্র বহাল রেখে সাধারণ শিক্ষকদের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাবেন এবং মাদরাসার জনবল কাঠামো সংশোধন করে প্রয়োজনীয় পদগুলো অন্তর্ভূক্ত করবেন এমনটাই সকলের প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন