please click here to view dainikshiksha website

শিশুর প্রতি আচরণ এবং শিশুর শিক্ষা

মাছুম বিল্লাহ | সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৭ - ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত।তাই যে কোন সচেতন ও সভ্য সমাজে শিশুকে দেয়া হয় সর্বোচচ অগ্রাধকিার। বয়স্করা চলে যাবে, শিশুরা সেই জায়গা দখল করবে, এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম।তাদের প্রতি আমাদের কিরুপ আচরণ করতে হবে এবং কেন করতে হবে তা আমরা কবি গোলাম মোস্তফার ’ ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে’ লাইনটির মধ্যেই খুঁজে পাই।লাইনটির মধ্যে লুক্কায়িত আছে শিশুদের প্রতি আমাদের কিরুপ আচরণ করতে হবে, তাদেরকে কি কি শিক্ষা দিতে হবে এবং কেন শিক্ষা দিতে হবে। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যত, তাদের মাধ্যমেই এই বিশ্বের নিয়ন্তর এগিয়ে যাওয়ার নিয়ম প্রতিফলিত হয়। যেসব শিশুরা দিব্যি মনের আনন্দে আর স্বাভাবকি চঞ্চলতা নিয়ে ঘুরে বেড়াচেছ , তাদেরকই যখন পড়তে বসানো হয় তখন দেখা যায় তারা পড়া বাদ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের দুষ্টুমিতে জড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন ধরনের বায়না ধরে, ঘুমের ভান করে। এই সময়ে বাবা কিংবা মা বিরক্ত হয়ে তাদের সাথে মেজাজ দেখান, রাগারাগি করেন এমনকি গায়ে হাত দিয়ে শাসন করেন। আসলে তাতে ফল হয় উল্টো। পড়ার বিষয়টি তার কাছে যেহেতু আনন্দদায়ক নয় এবং তার মতো করে কিছু হয়তো লেখা নেই কিংবা সেভাবে পড়ানো শুরু করা হয়নি বিধায় তারা এ ধরনের আচরণ করে। কাজেই বিষয়টি বাবা-মাকে অত্যন্ত সচেতনার সাথে বিবেচনা করতে হবে। কিভাবে তাদেরকে আনন্দ দেয়া যায় এবং আনন্দের মাধ্যমে পড়ানো যায় সেই বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। শিশুরা অনুরকণ প্রিয়, তারা তাদের চারপাশে যা দেখে তাই শেখে। কাজেই শিশুদের প্রতি আমাদের আচরণ করতে হবে খুব সাবধানতার সাথে। একজন বাবা কিংবা মা শিশুকে পড়তে বসিয়ে যদি অন্য কোন কাজে মানোনিবেশ করেন, তাহলে শিশুটিও কিন্তু ব্যাপারটি সেভাবে নিবে ।

খেলার ছলে, ছবি দেখিয়ে, গল্প বলে শিশুকে পড়ালে তারা মনোযোগী হবে, পড়তে আগ্রহী হবে। বই পড়া শিশুদের একটি ভীতির ব্যাপার, এই ভীতি থেকে তাদের কিভাবে মুক্তি দেয়া যায় সেই প্রচেষ্ট প্রথমত মা-বাবাকেই নিতে হবে। তারপর তাদের হাতে চমৎকার রঙিন বই তুলে দিতে হবে যাতে শিশুরা বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়।আমাদের আর একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে আর সেটি হচেছ বাচ্চারা অত্যন্ত অনুসদ্ধিৎসু। তারা তাদের সামনে ও আশে পাশে যা দেখে সেই সম্পর্কেই প্রশ্ন করে। এই প্রশ্ন একটি কিংবা দুটি নয়। তারা অনবরত প্রশ্ন করতে থাকে। এই বার বার প্রশ্ন করা অনেক সময় মা-বাবা, বড় ভাই বোন কিংবা অভিভাবকদের বিতৃষ্ণা বা বিরক্তির উদ্রেক করে। তাই অনেকেই তাদের ধমক দিয়ে বাচচাদের প্রশ্ন করা বিষয়টি থামিয়ে দেন। আসলে তাদের থামিয়ে দেওয়া কোনভাবেই ঠিক নয়। এতে একদিকে যেমন তাদের জানার আগ্রহকে বাধা দেওয়া হয় তেমনি মানসিকভাবেও তাদেরকে আঘাত দেওয়া হয়। তারা তখন আর ঐসব অভিভাবকদের কাছে সহজে কিছু পড়তে চাবেনা, প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে না। অথচ প্রশ্ন করার মাধ্যমে যা শেখা হয় তাই বাস্তব শেখা,তা তার আগ্রহ নিয়ে শেখা, তার অনুসন্দিৎসাকে সন্তষ্ট করার জন্য শেখা। কাজেই শিশুকে প্রশ্ন করতে দিন।

অনেক অভিভাবকের সাধারন একটি অভিযোগ হচেছ ’ আমার বাচচা একদম পড়তে চায়না, শুধু খেলাধুলা আর টিভি নিয়ে ব্যস্ত থাকে।’ আসলে একটি শিশুর এই বয়সে ওগুলো করাটাই স্বাভাবিক। কাজেই খেলার মতো করে যদি তাকে পড়ানো যায় তাহলেই সে পড়বে। এটির আর একটি প্রাকৃতিক কারণ হচেছ তাদের শিক্ষার জন্য শুধুমাত্র বইয়ের মধ্যে তাদের আটকে না রাখা।ছবি, রঙ, প্রাকৃতিক উপায়ে বস্তুর সাথে তাদের পরিচিত করানো, মৌখিকভাবে বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা দেওয়া। তারা সেগুলো মনে রাখতে পারবে। কোন বস্তুর কি গুণ, কোন প্রাণীর আচরণ কিরকম ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে তাদের ধারণা দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে অঙ্গভঙ্গি করে তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে , এই বিষয়গুলো তাদের মনে গেঁধে থাকবে।

এভাবেই তারা শিখবে কিন্তু অনেক অভিভাবক মনে করেন বাচ্চাকে সবকিছু বই পড়েই শিখতে হবে, বিষয়টি আসলে তা নয়। শিশুর শিক্ষা হতে হবে, আকর্ষণীয় ও প্রাকৃতিক উপায়ে। কোন কোন শিক্ষক শিশুদের ক্লাস শুরুর আগে সম্মিলিত গান বা কোরাস দিয়ে ক্লাস শুরু করেন। এতে শিক্ষার্থীরা কিছু শিখতে উদ্বুদ্ধ হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তত হয় কিছু শেখার জন্য। এসব শিক্ষকগন একটি অক্ষর, শব্দ, বাক্য এবং অনুচেছদকে গানে রুপান্তর করে শিক্ষার্থীদের কোরাস গাইয়ে থাকেন। এতে শিশু শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা অর্জিত হয়। কারন তারা তখন মানসিকভাবে চাঙ্গা থাকে, হাসিখুশি থাকে যা কিছু শেখার পূর্বশর্ত।  বয়সের সাথে সাথে মানুষের পাঠ্যাভাসের পরিবর্তন ঘটে। অল্প বয়সে জটিল বিষয়ের উপর লেখা বই ভাল লাগেনা। তখন রোমান্টিক ও কবিতার বই ভাল লাগার কথা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে জটিল বিষয়ের বই ভাল লাগে। কাজেই শিশুর পাঠ্যাভাস বাড়াতে সে ধরনের বইয়ের সাথে তাদের পরিচিতি ঘটাতে হবে। বই পড়ার বয়স যেমন শিশু বয়সে রৃপকথা, কৈশোর কিশোর উপন্যাস, গোয়েন্দা বই, সায়েন্স ফিকশন ও সাহিত্য , উচচমাধ্যমিকের পর সামাজিক, রোমান্টিক ও ননফিকশন এবং মধ্য বয়সে এই পাঠ আবার জটিল বিষয় পড়তে ভাল লাগে।

যেমন প্রবন্ধ, ইতিহাস, দর্শন ও ভ্রমণকাহিনী সম্পর্কিত বই। অর্থাৎ বয়স ও জীবনের সঙ্গে বই পড়ার যোগসূত্র রয়েছে। জীবনের শুরুতে নিজেদের আগ্রহের পাশাপাশি মা-বাবা এবং স্কুলে কেমন বই পড়তে উৎসাহ প্রদান করে সেটার ওপর নির্ভর করে অল্প বয়সে শিশু কেমন বই পড়বে। ’বুকট্রাস্ট’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, পাঠক বই পড়তে চান যেটা তাকে আরও আনন্দ দেবে, দ্বিতীয়ত, বইয়ের বিষয়বস্তু এমন চান যেটি নিজের জীবনের সঙ্গে মেলে। তৃতীয়ত, অনেকে বই পড়ে তাদের জীবনে উন্নতি ঘটাতে চান। চতুর্থত, সেই বই-ই পড়তে চান, যেটা তাকে অণুপ্রেরণা দেয়। যে যত বেশি বই পড়বে, পরবর্তী জীবনে সে তত বেশি সফলতা লাভ করবে। সন্তানের জ্ঞানের ভিত্তি শক্ত করার জন্য বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রথমে ছবিওয়ালা বই দেখাতে হবে। ছবি দেখে নাড়াচাড়া করবে। তারপর সে জানতে চাইবে। ছবির সাথে ধীরে ধীরে কিছু অক্ষরের সঙ্গে পরিচিয় করাতে হবে। পড়ে পড়ে শোনাতেও হবে। তারপর সে নিজে নিজেই জানতে চাইবে। সেই সঙ্গে শোনার দক্ষতাও বাড়বে, জানার আগ্রহ বাড়বে, কল্পনাশক্তি বাড়বে।

বাবা-মা হিসেবে একবার যদি তাদের এই অভ্যাস গড়ে তোলা যায় , তাহলে দিন যতই যাবে তারা ততই নিজ থেকে পড়তে চাবে।খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে। একটি পরিবারে যদি কয়েকটি বাচচা থাকে তাহলে তাদের মধ্যে বই পড়ার প্রতিযোগিতা তৈরি করা যায়। কিছু কিছু অভিভাবক আছেন যারা মনে করেন যে, ক্লাসের বই না পড়ে অন্য বই পড়লে শিশুদের সময় নষ্ট হচেছ। স্কুলের পড়ায় তারা অমনোযোগী হবে। আসলে এই পড়াই কিন্তু শিশুর আসল পড়া। ক্লাসের পড়া তার ভাল লাগছেনা কিন্তু পাস করার জন্য পড়তে হয়, আর এভাবে পড়া মানে তার মনে যা ভাল লাগে তাই তাকে পড়তে হচেছ।

শিক্ষা সাধারনত তিনটি উপায়ে অর্জিত হয়। আনুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক। শিক্ষার সুযোগের বিষয়টি অনেকটা নির্ভর করে সাক্ষরতার ওপর। প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক, আনানুষ্ঠানিক বা উপানুষ্ঠানিক যে কোন শিক্ষা গ্রহনের প্রস্তুতি হিসেবে প্রত্যোক শিক্ষার্থীকে অবশ্যই সাক্ষরতা জ্ঞান অর্জন করতে হয়।সাক্ষরতার সংজ্ঞা বিভিন্নভাবে নানা দেশে অনেক পূর্ব থেকেই প্রচলিত থাকলেও ইউনেস্কো ১৯৬৭ সালে প্রথম সাক্ষরতার একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা চিহ্নিত করে। তবে পরবর্তী সময়ে দেখা যায় যে, প্রতি দশকেই এই সংজ্ঞার পরিধি ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য কমপক্ষে তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হয়।শিশু নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট ছোট বাক্য লিখতে পারে কিনা এবং সে তার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সাধারন হিসাব নিকাশ করতে পারে কিনা। এই তিনটি বিষয়ে সক্ষম হলে তাকে সাক্ষরতা দক্ষতাসম্পন্ন বলা হয়।পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের নিজস্ব ভাষা রয়েছে এবং সকল ভাষারই অক্ষর বা বর্ণ রয়েছে। সেই অক্ষরের সাহয্যেই মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিচিত্র কথাবার্তা ও তত্ত্ব-তথ্য সম্পর্কে বিভিন্ন বই-পুস্তক বা লেখা পড়ে জানতে পারে, বুঝতে পারে।বাংলা ভাষায় ১১টি স্বরবর্ণ ও ৩৯টি ব্যঞ্জনবর্ণ আছে। বাংলাভাষা ছাড়াও আমাদের দেশে অনেক ভাষার মানুষ বসবাস করে। অনেক ভাষার অক্ষর বই-পুস্তকে লিখিতও নেই।

অক্ষর দৃষ্টিহীনতার শিকার প্রতিটি মানুষকে অক্ষরধারণাসহ নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে ও লিখতে পারা, দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সাধারন হিসাবনিকাশ করতে পারা এবং যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষার দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা বিষয়ে দক্ষতাসম্পন্ন হিসেব গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের সাক্ষরতা জ্ঞান খুব কম বয়সেই শুরু হয় এবং বিদ্যালয়ে কিছু অর্জনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।শিশু উন্নয়নের সব দিক শারীরক, মানসিক, সামাজিক-আবেগীয়, কগনিটিভ, ভাষা এবং সাক্ষরতা-একে অপরের সাথে সম্পর্কিত এবং নির্ভরশীল।ভাষা ও অক্ষরের সাথে যে সব শিশুদের অভিজ্ঞতা বা সংস্পর্শ যত কম, তাদের পড়তে শেখার সমস্যা তত বেশি।

পারিবারিকভাবে বই পড়ার অভ্যাস শিশুদের ওপর এক ধরনের সুপ্রভাব ফেলে। ইন্টারনেট, ফেসবুক আর স্মার্টফোনের এই যুগে শিশুদের এগুলো একেবারে বইরে রাখা যাবেনা, তবে এগুলোর সীমিত ব্যবহার এবং বই পড়ার অভ্যাস দুটোই পাশাপাশি করাতে পারলে সুফল আসবে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ব্র্যাক গণকেন্দ্র ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে ’বই পড়া’ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। আপনার শিশুদের এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করার সুযোগ দিন, তার জীবন পাল্টে যাবে। শিশুদেরকে বই মেলায় নিয়ে যান, শিশুপ্রহর নামে শিশুদের জন্য উন্মুক্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।বই পড়ার পাশাপাশি তাকে লিখতেও দিন, ছবি আঁকতে দিন, তার কল্পনার জগত বেড়ে যাবে।ছবিসমৃদ্ধ রঙিন বই তাদেরকে শুধু আগ্রহীই করে তুলবেনা, প্রকৃতির সাথে বইয়ের সম্পর্ক খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে। বইয়ে সে পাখী, ফুল, ফল, গাছপালা দেখবে এবং প্রকৃতিতেও এগুলো দেখতে পাবে, ফলে পড়া ও বাস্তবের সাথে তার এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠবে। যেসব বর্ণমালা দিয়ে উক্ত ফুল, ফল, পাখী ও গাছপালা লেখা হয়েছে সে সহজেই সেগুলো মনে রাখতে পারবে। পড়ে দেখা যাবে নিজের আগ্রহে সে এক এক বই পড়ছে, নিজে না বুঝলেও ছবির সঙ্গে কথা বলছে। অনেক সময় নিজে গল্প বানিয়ে নিচেছ।

তাকে একইসাথে বর্ণমালা ও যুক্তবর্ণের সাথে আকার ও ফলাও শিখিয়ে দিন।প্রথমে আকার ফলাবিহীন শব্দ যেমন চল, কল, নল ইত্যাদি তারপরে কার এবং পরবর্তীতে ফলা ও যুক্তবর্নবিশিষ্ট শব্দ তৈরির কায়াদাটা ধরিযে দিন। তারপর ছড়ার বই এবং গল্পের বই ধরিয়ে দিন। গল্পের বইয়ের ক্ষেত্রে ছবিসহ বনের পশু-পাখির গল্প যেমন খরগোশ কচছপের গল্প,কাক ও পানির গল্প, ঘুঘু ও পিপড়ের গল্প বলুন। গবেষণায় দেখা গেছে বইয়ের সংষ্পর্শে ও বই পড়ে শোনানোর মধ্য দিয়ে বড় করে তোলা শিশুদের সঙ্গে পরে তাদের সহজে ভাষা শেখা ও স্কুলে সাফল্যের সংযোগ রয়েছে। ২০১৫ সালে পেডিয়াট্রিকস জার্ণালে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানা গেছে যেসব শিশুর বাসায় বেশি বই আছে এবং শিশুকে বেশি বই পড়ে শোনানো হয়, তাদের মস্তিস্কের বাম অংশ উল্লেখযোগ্য হারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পেরিয়েটাল-টেম্পোরাল-অক্সিপেটাল অ্যাসোসিয়েশন করটেক্স নামে অভিহিত মস্তিস্কের এই অংশে শব্দ ও চোখে দেখার অনুভূতির সংমিশ্রণ ঘটে। একটু বড় শিশুরা শব্দ করে পড়লে মস্তিস্কের এই অংশ উদ্দিপীত হয়। কিন্তু শিশু চিকিৎসাবিদেরা লক্ষ করছেন, খুব ছোট বাচ্চাদের বইয়ের গল্প পড়ে শোনালেও একইভাবে মস্তিস্কের এই অংশ উদ্দীপিত হয়। মায়ের মুখে গল্প শোনার সময় বাচ্চা মনে মনে কল্পনার জাল বোনে।

তার কথার সঙ্গে সঙ্গে কল্পনার একটা যোগসূত্র স্থাপনের দক্ষতা অর্জিত হয়। গল্পের বইয়ে অনেক নতুন শব্দ থাকে, তাই গল্প পড়ে শোনালে বাচ্চাদের শব্দভান্ডার উন্নত হয় এবং কল্পনাশক্তি বাড়ে।তার ফল বিদ্যালয়েও পরে। শিশুদের বয়স যখন ৬-৭ তখন তারা লিখিত যা পাবে তাই পড়তে চাবে যদি ছোট থেকেই তাদেরকে সেভাবে গড়ে তোলা হয়।৮-৯ বছর বয়সে তারা এক একজন নিয়মিত পাঠকে পরিণত হবে।

ছোটবেলা থেকেই স্কুলের বইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়ার অভ্যাস শিশুদের মধ্যে তৈরি করতে হবে। আমরা অনেকে মনে করি গল্পের বই পড়া মানে ক্লাসে অমনোযোগী হওয়া, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা। আসলে বিষয়টি ঠিক তা নয়।আমাদের বুঝতে হবে, স্কুলের বই শিশুকে তার ভবিষ্যত জীবন ও জগত সম্পর্কে সম্পূর্ন ধারণা দেয়না। আর ক্লাসের পড়াশুনা নিয়ে বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করা কতটা যুক্তিসঙ্গত সে বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। সুকুমার রায়ের একটি কবিতা হয়তো পাঠ্য বইয়ে আছে। সেই একটি কবিতা পড়া আর তার সুকুমার রায়ের পুওে একটি বই পড়া এক কথা নয়। যে শিশুটি সুকুমার রায়ের কবিতা সম্পর্কিত পুরো একটি বই পড়ে ফেলবে সুকুমার রায় সম্পর্কে তার ধারণা অবশ্যই আলাদা হবে। শিশুরা রুৃপকথার বই পড়তে বেশি পছন্দ করে।ঠাকুরমার ঝুলি, ডিজনিল্যান্ডের রঙ্গিন বই যে কোন শিশুকে আকৃষ্ট করবে। আমাদের দেশীয় শিশুসাহিত্যও তাদেরকে পড়তে দিতে হবে।

বই জ্ঞানের প্রতীক, আনন্দের প্রতীক। শিশুকে এই প্রতীকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। তাকে আলোকিত মানুষে রুপান্তরিত করতে হবে। তার চিন্তার জগত, কল্পনার জগতকে বিস্তৃত করতে হবে আর সেটি সম্ভব বিভিন্ন ধরনের বই পড়ানোর মাধ্যমে। গল্পের বই নিজে না পড়ে শিশুকে দিয়ে পড়াতে পারেন তাতে তার উচ্চারণ ক্ষমতা বাড়তে ও জড়তা কেটে যাবে। বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে শিশুর পছন্দের চরিত্রকে নিয়ে লেখা কিংবা কমিক কিনে দিতে পারেন। রংচঙে বই বাচ্চাদের অনেক আকর্ষণ করে। শিশুরা খুব অনুকরণপ্রিয়। তাই নিজেও নিয়ম করে একটা সময় বই পড়র জন্য রাখুন। অভ্যাসটা ধীরে ধীরে আপনার শিশুর মধ্যেও সঞ্চারিত হবে । পরিবারে একাধিক শিশু থাকলে তাদের মধ্যে বই পড়ার প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যেতে পারে। আপনার আশেপাশের সহজ বিষয়গুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আপনার শিশুকে বিজ্ঞানে উৎসাহী করবে।কদিন পর দেখা যাবে সে আপনার চারপাশের অনেক বিষয় নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচেছ। তার কৌতুহল নিবৃত্ত করার জন্য আপনাকে হাজারো কেন’-এর উত্তর দিতে হবে। তার ’কেন’এর উত্তর দেয়ার জন্য আপনাকেও অনেক কিছু পড়াশুনা করতে হবে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক।

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন