করোনায় মৃত্যু : ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দ্বিমত - করোনা আপডেট - দৈনিকশিক্ষা

করোনায় মৃত্যু : ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দ্বিমত

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণে সরকারি তথ্যের পাঁচগুণ বেশি মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ডব্লিউএইচওর এই প্রতিবেদন সঠিক নয় বলে দাবি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের। আপাত দৃষ্টিতে ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদন ঠিকই আছে বলে মনে করছেন দেশের জনস্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলছেন, মহামারীতে সারাদেশে ‘বহু’ মানুষ মারা গেছে, যাদের কোভিড পরীক্ষা হয়নি, হাসপাতালে চিকিৎসা পায়নি। বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নমুনা পরীক্ষা ‘কম’ হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা একটি ‘স্বাধীন কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়ে বলেছেন, সরকারের উচিত রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা, যারা মহামারীতে মৃত্যুর তথ্য খুঁজে বের করবেন।

দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহামারীর দুই বছরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ২৯ হাজার ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারীতে বাংলাদেশে সরকারি তথ্যের পাঁচগুণ বেশি মানুষ মারা গেছে। এ হিসাবে দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দেড় লাখ।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘করোনার উপসর্গ বা লক্ষণ নিয়ে সারাদেশে বহু সংখ্যক মানুষ মারা গেছেন। কিন্তু তারা টেস্ট করাতে পারেনি, হাসপাতালে আসতে পারেনি, ভর্তি হতে পারেনি বা চিকিৎসা পায়নি। হাসপাতালেও বহু মানুষ মারা গেছেন, যাদের টেস্ট করা যায়নি। তারা করোনায় আক্রান্ত ছিলেন কি-না সেটি বুঝা যায়নি। এই তথ্য স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে আসেনি।’

মৃত্যুর তথ্য গোপন রাখতে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের ভূমিকা রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘যারা সরকারি চাকরি করে তারা ভয়ে থাকে, যদি মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায় তাহলে তাদের চাকরিটা যেতে পারে। পানিশমেন্ট ট্রান্সফার হতে পারে। সুতরাং একবারে সাক্ষ্য-প্রমাণ না পেলে তারা বলবেন না, এটি করোনা (মৃত্যু হয়েছে)।’

করোনার প্রভাব শরীরের সর্বত্রব্যাপী পড়ে উল্লেখ করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘ফুসফুস, লিভার, হার্ট, ব্রেইন, সর্বত্রব্যাপী। ইদানিং কালের গবেষণায় দেখা গেছে, করোনার সাধারণ লক্ষণ থেকে হয়তো মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু পরবর্তীতে হার্ট ব্লক হয়ে সে হয়তো মারা গেছেন; তখন তার করোনা নেগেটিভই ছিল। গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের বহু লোক মারা গেছেন। ডব্লিউএইচও এই ধরনের মৃত্যুকে করোনায় মৃত্যু হিসেবেই ধরেছে।’

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে ভিন্নমত পোষণ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দাবি করেছেন, সরকারের দেয়া তথ্য ঠিক আছে। ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়া এবং নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করবে সরকার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের পদ্ধতি অনুসরণ করে মৃত্যুর প্রতিবেদন তৈরি করেছে। বিশ^ব্যাপী এই পদ্ধতি স্বীকৃত। কিন্তু করোনা মহামারীতে বিশে^র বিভিন্ন দেশ যেভাবে মৃত্যুর সংখ্যা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশও সেভাবেই তা করেছে।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেনের অভিমত, ডব্লিউএইচওর মৃত্যুর প্রতিবেদন তৈরির পদ্ধতি ঠিকই আছে। যে পদ্ধতিতে মৃত্যুর এ সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। তবে যেই তথ্যের ভিত্তিতে তারা পরিসংখ্যান তৈরি করেছে তার উৎস জানতে হবে। তারা যেখান থেকে এই তথ্য পেয়েছেন তা সঠিক কি-না, নাকি ‘অনুমান’ করে তা করেছেন সেটি দেখতে হবে।

তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর কারণ ঠিক করতে একটি স্টাডি হওয়া উচিত। সারাদেশেই আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে। তিন মাসেই এটি করা সম্ভব। যারা মারা গেছেন সবাইকে দাফন করা হয়েছে, সৎকার করা হয়েছে। কাউকেই নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়নি।’

স্বাভাবিক সময়ে একটি দেশে বছরে গড়ে কত সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়, সেই সংখ্যার অতিরিক্ত সংখ্যাটা বের করে করোনায় মৃত্যুর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। এতে সরাসরি কোভিডে মৃত্যু বলে নিশ্চিত নয়, এমন কারণগুলোও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। কারণগুলোর মধ্যে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে না পারাও রয়েছে।

ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে কোভিড আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি দাঁড়ায় ভারতে প্রায় ৪৭ লাখ। যদিও দেশটির সরকারি হিসাবে সেখানে সোয়া পাঁচ লাখ মানুষ মারা গেছেন। ভারত সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই তথ্যকে ‘বিভ্রান্তিকর, ভুল তথ্যে ভরা ও ষড়যন্ত্রমূলক’ আখ্যায়িত করেছে।

ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে কোভিড মহামারী শুরুর বছর ২০২০ সাল শেষে অতিরিক্ত ৪৬ হাজার ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২১ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এক লাখ ৪০ হাজার ৭৬৪ জন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য ঠিক আছে দাবি করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক একটি অনলাইন গণমাধ্যমকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে চিকিৎসা অনেকে পায়নি বা নেয়নি, হাসপাতালে যায়নি, সে কারণে যে মৃত্যু ঘটেছে, সেটা সরাসরি করোনাভাইরাসের কারণে মারা গেছে, তা ঠিক নয়। ‘ননকমিউনিকেবল ডিজিজে’ মৃত্যু বাড়তে পারে। এই সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারের কাছে নেই বলে জানান মন্ত্রী।

এ বিষয়ে অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের যে অফিসিয়াল রিপোর্ট, মৃত্যু তার চেয়ে অবশ্যই বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো- কত বেশি? তবে ডব্লিউএইচও এটিও স্বীকার করেছে, আমার যে মডেলিং করেছি তার বেশকিছু সীমাবদ্ধতা আছে; তার মানে এটি যে একেবারে নির্দিষ্ট হবে তা নয়। তবে ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনকে একেবারে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা জানতে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করতে হবে। নানা কারণে বিতর্কিতদের এই প্যানেলে রাখা যাবে না।’

মৃত্যুর সংখ্যা কম দেখানোর ফলে বাংলাদেশ ডব্লিউএইচওর বিভিন্ন ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে আশঙ্কা করে ড. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘সংস্থাটি মনে করতে পারে, বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই ভালো। তাদের আর সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। এজন্য আমাদের উচিত মৃত্যুর সঠিক তথ্য খুঁঁজে বের করা।’

যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যানভিত্তিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ডোমিটার’ বলছে, গতকাল পর্যন্ত সারাবিশে^ করোনা মহামারীতে ৬২ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বিভিন্ন দেশের সরকারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ঠিক করা হয়েছে।

ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনা মহামারীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গত দুই বছরে কোভিড মহামারেিত যে পরিমাণ মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে ওইসব দেশে মৃত্যুর সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি মৃত্যু হয়েছে।

ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, করোনায় যুক্তরাষ্ট্রে গতকাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ১০ লাখ ২৪ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্যান্য দেশের মধ্যে ব্রাজিলে ছয় লাখ ৬৪ হাজার, ভারতে পাঁচ লাখ ২৪ হাজার, রাশিয়ায় তিন লাখ ৭৮ হাজার, মেক্সিকোতে তিন লাখ ২৪ হাজার, পেরুতে দুই লাখ ১২ হাজার, যুক্তরাজ্যে এক লাখ ৭৬ হাজার, ফান্সে এক লাখ ৪৭ হাজার, জার্মানিতে এক লাখ ৩৭ হাজার, ইতালিতে এক লাখ ৬৪ হাজার, ইন্দোনেশিয়ায় এক লাখ ৫৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

মৃত্যু বা এর কারণ পরিমাপের জন্য আন্তর্জাতিক কোন মানদ- নেই। দেশগুলো নিজস্ব উপায়ে মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড করে থাকে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপেক্ষাকৃত সঠিক প্রক্রিয়াগুলোর একটি হলো- কোন দেশে বছরে গড়ে কত সংখ্যক মানুষ মারা যাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, সেই সংখ্যার অতিরিক্ত সংখ্যাটা বের করা। ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনের বলা হয়েছে, মৃত্যুর গণনার প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ দেশ না হলেও প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত ৯ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা গেছেন। কিন্তু ভারতে প্রকৃত মৃত্যু হয়েছে ৪৭ লাখ, রাশিয়ায় ১১ লাখ ও ইন্দোনেশিয়ায় ১০ লাখ মানুষ।

ডব্লিউএইচওতে কাজ করা মহামারী বিশেষজ্ঞ প্রভাত ঝা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত মৃত্যুর তুলনায় সরকারি হিসেবে ১৫ শতাংশ কম মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে। এর বেশিরভাগই প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা যেমন বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যেসব মৃত্যু হয়েছে সেগুলো এড়িয়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের মতো অনেক মৃত্যু এড়িয়ে যায়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়-ইউজিসির ১২ কর্মকর্তার বিদেশ সফর বাতিল - dainik shiksha শিক্ষা মন্ত্রণালয়-ইউজিসির ১২ কর্মকর্তার বিদেশ সফর বাতিল প্রশ্নফাঁসে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারাই জড়িত, দুজনকে খুঁজছে পুলিশ - dainik shiksha প্রশ্নফাঁসে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারাই জড়িত, দুজনকে খুঁজছে পুলিশ পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে সিনথেটিক ড্রাগসের ভয়াবহতা - dainik shiksha পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে সিনথেটিক ড্রাগসের ভয়াবহতা প্রভাষকদের পদোন্নতি কমিটির সভাপতি হবেন ডিসিরা - dainik shiksha প্রভাষকদের পদোন্নতি কমিটির সভাপতি হবেন ডিসিরা টানা বর্ষণে সিলেটে বন্যা, বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ - dainik shiksha টানা বর্ষণে সিলেটে বন্যা, বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ড্রাইভারকে দেয়া হচ্ছে উপসচিবের সমান বেতন - dainik shiksha ড্রাইভারকে দেয়া হচ্ছে উপসচিবের সমান বেতন ঢাকা ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান - dainik shiksha ঢাকা ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান please click here to view dainikshiksha website