শিক্ষক শিক্ষার্থী অভিভাবক সম্পর্ক - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

শিক্ষক শিক্ষার্থী অভিভাবক সম্পর্ক

প্রফেসর ড. মো. লোকমান হোসেন |

শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকের সম্পর্ক যত ভাল ও বন্ধুত্বপূর্ণ হবে, শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে তত ভাল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন। 

ছাত্র ও শিক্ষকের সর্ম্পক হলো একটি সুন্দর ও পবিত্র সর্ম্পক। এই সম্পর্ক খুবই সাবলীল, মধুর, স্বতঃস্ফুর্ত আবার গাম্ভীর্যপূর্ণও। শিক্ষক প্রয়োজনে শিক্ষার্থীর ওপর অভিভাবকসূলভ কঠোরতা ও শাসন আরোপ করেন, আবার কখনো বা বন্ধুর মতো ভালবাসেন, পরামর্শ দেন, উৎসাহ যোগান। স্নেহ ও ভালবাসা আর শাসনের মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের মনে স্বপ্নের বীজ বপন করেন। শিক্ষার্থীরা সে স্বপ্নকে লালন করে। একজন শিক্ষক তখনই সফল হন যখন তিনি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করতে পারেন। আর শিক্ষার্থীরা তখনই সফল হয় যখন শিক্ষকের নির্দেশিত শিক্ষাকে আত্মস্থ করতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন ছাত্র শিক্ষক সুসম্পর্ক। তাই এই সম্পর্ক উন্নয়নে যা করতে হবে তা হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে অবশ্যই পরস্পরের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলোকে যথাযথভাবে পালন করতে হবে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রতি সর্বদা সন্তুষ্ট থাকবেন।

আমাদের স্কুলগুলোতে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যে খুব একটা সম্মানজনক অবস্থায় নেই, সেটা সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনাতেই বোঝা যায়। নুসরাত হত্যার সঙ্গে জড়িত সোনাগাজীর মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত এপ্রিলে রাজধানীর ডেমরার ডগাইর এলাকার নূরে মদিনা মাদ্রাসার ছাত্র আট বছরের মনির হোসেনের হত্যার সঙ্গে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ দুই শিক্ষার্থী জড়িত বলে প্রমাণিত। প্রধান শিক্ষক আফজাল হোসেন পরীক্ষার হলে সবার সামনে এক ছাত্রের চুল কেটে দেন। অপমান সহ্য করতে না পেরে ছাত্রটি আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ছাত্রী অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। প্রশ্নের আঙুল ওঠে শিক্ষকসমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি। কিন্তু কোথাও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মানবিক সম্পর্কের বিষয়টির কথা উঠে আসেনি। এসব ঘটনা ঘটতেই থাকবে, যদি শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সম্পর্কের উন্নতি না হয়।

বিশ ত্রিশ বা পঞ্চাশ বছর আগেও শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ছিল গুরু শিষ্যের। শিষ্য যে ভক্তি নিয়ে গুরুকে সমীহ করতেন, গুরুরাও সে মর্যাদা ধরে রাখতে নিজেদের সে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য পড়াশোনা করতেন ও আদর্শবান হতেন। শিক্ষকদের মর্যাদার জায়গাটা আগের তুলনায় অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো  মানুষের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। শিক্ষক এবং ছাত্রের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা কমে গেছে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের কারণেই এমনটা ঘটছে। শিক্ষা এখন আর জ্ঞান আহরণের বিষয় নেই। শিক্ষা হয়ে গেছে ভালো চাকরি পাওয়ার সিঁড়ি। আমাদের শিক্ষকরাই স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব শেখাচ্ছেন। বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে বলেই একই শিক্ষকের ক্লাস করে এসে তার কাছে প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া যাচ্ছে না। একই স্কুলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতি বছর জোর করে সেশন ফি বা ভর্তি ফি নেয়া হচ্ছে। 

প্রাচীনকালে জ্ঞান আহরণই ছিল শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য  সামনে রেখে শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের জ্ঞানদান করতেন। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যও ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকের প্রধান কাজ হলো জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আদর্শ নাগরিক হিসাবে তৈরি করা এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সুষ্ঠু সম্পর্ক গড়ে তোলা। শিক্ষা এখন সনদমুখী। চাকরি পাওয়া ছাড়া এখন শিক্ষার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে শিক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষা পদ্ধতি বদলাতে হবে। ত্রৈমাসিক, ষাম্মাসিক ও বার্ষিক পরীক্ষার বদলে সাপ্তাহিক ক্লাস টেস্টের মতো সৃজনশীল পরীক্ষা নিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থা বদলে দেওয়ায় জাপানে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মাত্রা কমে এসেছে। শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়াতেও এখন সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে।

ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক দুনিয়ার সেরা সম্পর্কগুলোর একটি। আগের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক আর বর্তমান সময়ের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মধ্যে ব্যবধান অনেক। শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, ব্রতও বটে। অন্য সব পেশা থেকে  এ পেশাটা একটু ভিন্ন ধরনের। কেননা এখানে উপদেশদাতা বা নির্দেশনাদানকারী যদি নিজেই বিশ্বস্ততার মধ্যে না থাকেন অর্থাৎ শিক্ষক যা উপদেশ দেন তা যদি তিনি নিজে পালন না করেন বা নির্ভুল না পড়ান তাহলে তার পাঠদান কার্যকর হয় না। সঠিক পদক্ষেপ, পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিক্ষকরাই পারেন বিশ্বমানের অর্জিত শিক্ষা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে শিক্ষার্থীকে সঠিক দীক্ষায় দীক্ষা দিতে। তাই ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক হওয়া উচিত অভিভাবকতুল্য ও বন্ধুসুলভ। শিক্ষক হবেন ছাত্রের গর্ব আর ছাত্র হবে শিক্ষকের অহংকার। 

শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক সম্পর্ক নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর সেমিনারের বা কর্মশালা আয়োজন করলে ভালো ফল বয়ে আনে। শিক্ষকের ভালোবাসা, স্নেহের সংস্পর্শে খারাপ বা কম মনোযোগী শিক্ষার্থীও ভালো হয়ে যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা য একজন শিক্ষককে সম্মান ও আগ্রহভরে ভক্তি করে মনেপ্রাণে স্থান দিয়ে থাকে তখনই যখন শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে বন্ধুর মত। সকল শিক্ষার্থীর নাম ধরে ডাকতে পারাও সম্পর্ক স্থাপনের একটি চমৎকার কৌশল। এতে তারা উৎসাহ বোধ করে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, পছন্দের বিষয় এবং তাদের আকাঙ্খার দিকে নজর রাখতে পারলে তারা মনে করবে স্যার/ম্যাডাম আমার দিকে বিশেষ নজর রাখেন। এতে শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে গভীর ভাবের তৈরি হয়। শিক্ষক বন্ধু হলেও মনে রাখতে হবে মা বাবার মত শিক্ষকের সম্মান যেন অক্ষুন্ন থাকে। শ্রেণিতে নানা কৌশল অবলম্বন করে শিক্ষার্থীদের মন্তব্য ও প্রশ্ন করাকে প্রসংশা করতে হবে। শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে খুব আনন্দিত ও উৎফুল্ল থাকতে হবে, শিক্ষার্থীরা যেন বুঝতে পারে শিক্ষাদানে শিক্ষার্থীদের সংস্পর্শে এসে তিনি খুবই আনন্দিত ও উৎফুল্ল বোধ করছেন; শিক্ষার্থীদের চোখে চোখ রাখতে হবে এতে শিক্ষার্থীদের সাথে সততা এবং সমান দৃষ্টি রাখা প্রকাশ পায়; শিক্ষক হলেন প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে দার্শনিকের মত। সকল শিক্ষার্থীর প্রতি সমান দৃষ্টি রাখতে হবে; পাঠ্য বইয়ের অনুশীলন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মিলে করলে এটিও ভাল সম্পর্ক স্থাপনে চমৎকার ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থীদের জীবনধর্মী ও বাস্তবমুখী দক্ষতা শেখানোর ওপর জোর দেয়া উচিত। শিক্ষার আলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য শিক্ষক শিক্ষার্থী আর অভিভাবকের এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। 

শুধু মেধাবী দেখে শিক্ষক নিয়োগ দিলেই হবে না, তাদের অবিরত উন্নয়ন, পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য কমিশনকে কাজ করতে হবে। প্রচলিত ব্যবস্থায় শিক্ষকদের শুধু ফরমাল প্রশিক্ষণ নিলেই চলবে না। জীবনে অনেক ইনফরমাল বিষয় থাকে যা শিক্ষকতা জীবনে, বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে ঘটে থাকে সেগুলোর সঙ্গে পরিচয় ও সেগুলোর সমাধান বিশেষ কমিশনের মাধ্যমে করানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে শিক্ষকদের উন্নয়ন ও শিক্ষার উন্নয়ন যে আদলে চলছে তাতে পুরো শিক্ষা প্রশাসন ও শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের খুব ভালো কিছু দিতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। শিক্ষকদের মানোন্নয়নের নিমিত্ত যে সকল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানেও মানসম্মত প্রশিক্ষক ও তাঁদের পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে। যোগ্যতাভিত্তিক পদায়ন হচ্ছে না। শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা বা মনিটরিং নিশ্চিতকরণে যথাযথ কোন উদ্যোগ না নিলে অচিরেই শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধির পরিবর্তে অবনয়ন হবে এবং ২০৩০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এসডিজি ফোর অথাৎ গুণগত শিক্ষা অর্জন কেবলই প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকবে। একটি প্রবাদ আছে একটি দেশকে ধ্বংস করতে হলে আধুনিক মারণাস্ত্রের প্রয়োজন নেই কেবল শিক্ষার ব্যবস্থায় অনিয়ম করে দিলেই অযোগ্য সব শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসক, প্রশাসক, ব্যবসায়ী তৈরি হবে দেশ এমনিতেই ধ্বংস হয়ে যাবে। একজন ভাল শিক্ষক একজন ছাত্রের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে পারেন। তাই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত ও দৃঢ় হওয়া আবশ্যক। স্নেহ ভালবাসা শ্রদ্ধা আর সম্মানে যে সম্পর্ক রচিত হয়, সে সম্পর্ক যেন সর্বদাই অটুট থাকে। ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকের পবিত্র সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা রাষ্ট্রীয়ভাবে সকলের জন্যই মঙ্গলজনক।

 
লেখক: প্রফেসর ড. মো. লোকমান হোসেন, প্রাক্তন মহাপরিচালক, নায়েম। 

২০২২ খ্রিষ্টাব্দে স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে স্কুলের ছুটির তালিকা আবরার হত্যা : ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড, পাঁচ জনের যাবজ্জীবন - dainik shiksha আবরার হত্যা : ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড, পাঁচ জনের যাবজ্জীবন ১২ বছর পূর্ণ না হলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি নয় - dainik shiksha ১২ বছর পূর্ণ না হলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি নয় সব বিভাগে ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর - dainik shiksha সব বিভাগে ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর স্কুলে ভর্তির আবেদনের সময় বাড়লো - dainik shiksha স্কুলে ভর্তির আবেদনের সময় বাড়লো চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ - dainik shiksha চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ শৈত্য প্রবাহ আসছে , তাপমাত্রা নামবে ৬ ডিগ্রিতে - dainik shiksha শৈত্য প্রবাহ আসছে , তাপমাত্রা নামবে ৬ ডিগ্রিতে সব আসামির মৃত্যুদণ্ড চান আবরারের মা - dainik shiksha সব আসামির মৃত্যুদণ্ড চান আবরারের মা please click here to view dainikshiksha website