৫৪৪ দিন পর আজ দেখা, শিক্ষাঙ্গনে ফিরছে প্রাণ - কলেজ - দৈনিকশিক্ষা

৫৪৪ দিন পর আজ দেখা, শিক্ষাঙ্গনে ফিরছে প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক |

সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ফের বাজবে ঘণ্টা। ফিরবে চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য। হুল্লোড় করে কোমলমতি শিশুরা ঢুকবে ক্লাসে। টানা ৫৪৪ দিন পর আজ রোববার ক্লাসে ফিরবে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা পাবেন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সান্নিধ্য। সহপাঠীদের সঙ্গ পাবে শিক্ষার্থীরা। শহরাঞ্চলের ঘরবন্দি শিশুরা পাবে মুক্তির আনন্দ।

স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা মিলিয়ে সারাদেশে অন্তত দুই লাখ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা মুখর হয়ে উঠবে শিক্ষার্থীদের পদচারণায়। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সংখ্যা অন্তত চার কোটি। সর্বশেষ গত বছরের ১৬ মার্চ তারা সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণে অংশ নিয়েছিল। করোনার কারণে ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অবশ্য বন্যাদুর্গত ১৪টি জেলার সাত শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কিছু ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ খুলছে না।

দেড় বছরের বেশি সময় পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলেও একসঙ্গে সব শ্রেণির ক্লাস শুরু হচ্ছে না। ২০২১ ও ২০২২ সালের এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাসে যেতে হবে। বাকিদের সপ্তাহে এক দিন করে মাত্র দুটি বিষয়ের ক্লাস হবে। দীর্ঘ বিরতির পর শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই প্রস্তুত। গতকাল শনিবার শেষ মুহূর্তেও প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে শিক্ষকদের। রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় সদরের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের ফুল ও চকলেট দিয়ে বরণ করে নেবেন শিক্ষকরা।

প্রাথমিকের জন্য ১৬ দফা নির্দেশনা আর মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ১৯ দফা। তবে, এখন দেখার বিষয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এর কতটুকু মানাতে ও মানতে পারেন। সংক্রমণ বেড়ে গেলে আবারো বন্ধ হতে পারে স্কুল-কলেজ এমন ঘোষণা রয়েছে। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার সার্বিক বিষয় দেখতে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি আজ রোববার সকাল ১০টায় আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে যাবেন। তারপর তিনি কলাবাগান লেক সার্কাস স্কুলে যাবেন।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, এখন বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণ করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা। অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম শনিবার বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন পুরোপুরি সুনিশ্চিত করতে হবে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে মাস্ক দিতে হবে। করোনাকালে শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে একটি বড় প্রকল্পও গ্রহণ করা প্রয়োজন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন,  শুরুতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট শ্রেণির দুটি করে ক্লাস শুরু হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরে স্বাভাবিক ক্লাস রুটিনে ফেরার চেষ্টা করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, 'করোনায় শিক্ষাব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্থ-- এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। করোনার কারণে এক শ্রেণির পড়া ঠিকমতো না পড়েই শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শ্রেণিতে উঠেছে। এটি ভয়াবহ ক্ষতি। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এখন উদ্যোগ নিতে হবে।'

সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায়। মে মাস থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা ও জুলাই মাস থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকা, দুর্বল ও ধীরগতির ইন্টারনেট এবং ইন্টারনেটের উচ্চমূল্যের কারণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষেই অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব হয়নি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন ব্যাচের ভর্তিও পিছিয়ে গেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অন্তত ৫০০ পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। বড় ধরনের সেশনজটে পড়তে হয়েছে শিক্ষার্থীদের।

এক দশক ধরে পূর্বনির্ধারিত শিক্ষাসূচি অনুযায়ীই চলছে শিক্ষাব্যবস্থা। নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয় পাবলিক পরীক্ষা। প্রতিবছর ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি ও ১ এপ্রিল এইচএসসির সূচি ছিল সব শিক্ষার্থীরই জানা। যথাসময়ে ফল প্রকাশ শেষে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় শিক্ষার্থীরা। প্রতিবছরে যথাযথভাবে সিলেবাস শেষ করেই নেওয়া হয় বিভিন্ন শ্রেণির পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট নেমে এসেছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সব এখন এলোমেলো।

শিক্ষার্থীদের বরণ করতে মুহূর্তের প্রস্তুতি: গতকাল শেষ মুহূর্তেও প্রস্তুতি নিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শ্রেণি কার্যক্রম শুরুর জন্য। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শ্রেণিকক্ষগুলোতে জমা ধুলো-ময়লা পরিস্কার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী রাখাসহ নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ।

শুক্রাবাদের নিউ মডেল হাইস্কুলে। স্কুল আঙিনা পরিস্কারের কাজ চলছিল ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাইস্কুলেও।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কামরুন নাহার মুকুল বলেন, শিক্ষকরা গেটে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছাত্রীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বরণ করে নেবেন।

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, আজ সকাল সাড়ে ৭টায় তার প্রতিষ্ঠানে ২০২১ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হবে। আমাদের দিবা শাখায় শিক্ষার্থী বেশি। তবু আমরা চাচ্ছি, গেটে একসঙ্গে যেন ৫৫০ জনের বেশি জটলা না হয়। আমাদের মোট ৫৪টি ক্লাসরুমের মধ্যে ৪০টি ব্যবহার করে আমরা ক্লাস নেব।

প্রস্তুতি কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক নয়, গতকাল শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরাও। দেখা গেছে, শনিবার বইয়ের লাইব্রেরি ও স্টেশনারিগুলোয় ভিড় বেড়েছে। রাজধানীর নীলক্ষেত, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার দোকান ঘুরে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা অটোপাস পেয়ে পরবর্তী বর্ষে উত্তীর্ণ হলেও অনেকেরই বই কেনা হয়নি। এ ছাড়া স্কুল খুলবে, তাই তারা বেশ আগ্রহ নিয়ে নতুন খাতা-কলম কিনতে মার্কেটে এসেছে।

অনেক অভিভাবকও সন্তানের জন্য শিক্ষা উপকরণ কিনতে এসেছেন। গত কয়েকদিনে টেইলারিং শপগুলোগুতেও স্কুল ড্রেস বানাতে ভিড় ছিল। নীলক্ষেত বুকস গার্ডেনের সামনে বই কিনতে আসা হাবিবুর রহমান জানান, উচ্চ মাধ্যমিকের দুটি বই ও এক ডজন পছন্দের কলম কিনতে এসেছেন। তিনি বলেন, অটোপাস পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়ে অনলাইন ক্লাস করেছেন। সরাসরি সহপাঠীদের সঙ্গে রোববারই দেখা হবে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস: বিদ্যালয় ঘরবন্দি শিক্ষার্থীরা যেমন আনন্দে উদ্বেলিত, তেমনি উচ্ছ্বসিত শিক্ষকরাও। রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আমেনা বেগম বলেন, শিক্ষকের আনন্দ শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞান বিলানোর মাঝেই। সেটিই শুরু হতে যাচ্ছে। আমরা উচ্ছ্বসিত, সব রকমের প্রস্তুতি রয়েছে। 

স্বস্তিতে নেই অভিভাবকরা: স্কুল খোলার খবরে পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই অভিভাবকরা। করোনা সংক্রমণের মাঝেই স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ায় তাদের মাঝে কিছুটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েই গেছে। অভিভাবক শহীদুল ইসলাম বলেন, সন্তানের পড়াশোনা তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার জীবনটা আরও বেশি মূল্যবান। নিজের কন্যার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, স্কুল কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবে, তা এখনও জানি না। স্কুল থেকেও কিছু বলেনি। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা যতটা সচেতন, স্কুলের শিশুরা ততটা নয়। তারা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলেই একে অন্যের হাত ধরবে, পাশে বসবে- এটাই রিস্ক ফ্যাক্টর।

বিশিষ্টজন যা বলছেন: করোনার সংক্রমণ বাড়লে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবার বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গতকাল শনিবার জামালপুর সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পাঠদান চললে করোনার সংক্রমণ বাড়ার সম্ভাবনা কম। এর পরও যদি সংক্রমণ বেড়ে যায় তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবার বন্ধ করে দেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, যদি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধি না মানে, অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি আমরা অবহেলা করতে পারি না।

শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, খোলার পর শিখন ঘাটতি পূরণ, বাল্যবিয়ে রোধ ও ঝরে পড়াদের ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

উচ্চতর গ্রেড পাচ্ছেন ১ হাজার ৮৮ শিক্ষক - dainik shiksha উচ্চতর গ্রেড পাচ্ছেন ১ হাজার ৮৮ শিক্ষক প্রাথমিকে শিক্ষকসহ অন্যান্য পদ ‘বাড়ছে’ - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষকসহ অন্যান্য পদ ‘বাড়ছে’ ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষাবিমা’ চার্জমুক্ত রাখার নির্দেশ - dainik shiksha ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষাবিমা’ চার্জমুক্ত রাখার নির্দেশ এমপিওভুক্ত হলেন দেড় হাজার শিক্ষক-কর্মচারী - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হলেন দেড় হাজার শিক্ষক-কর্মচারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এখনো সংক্রমণের খবর আসেনি : শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এখনো সংক্রমণের খবর আসেনি : শিক্ষামন্ত্রী স্বরাষ্টমন্ত্রীর সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান নেতাদের মত বিনিময় - dainik shiksha স্বরাষ্টমন্ত্রীর সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান নেতাদের মত বিনিময় শিক্ষকদের একটা বড় অংশ ঘটনাচক্রে শিক্ষক : শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষকদের একটা বড় অংশ ঘটনাচক্রে শিক্ষক : শিক্ষামন্ত্রী ডিসেম্বর পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ডিসেম্বর পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকা বিএড স্কেল পেলেন ৫৮ শিক্ষক - dainik shiksha বিএড স্কেল পেলেন ৫৮ শিক্ষক please click here to view dainikshiksha website